রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ম্যাকরঁ বলেন, গাজার পরিস্থিতি কূটনৈতিক দাবির সঙ্গে মাটির বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট করে দিয়েছে। আসলে তাঁর এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগেই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প তাঁর গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
‘আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়?’
ম্যাকরঁ স্মরণ করিয়ে দেন, এক বছর আগে বেশ কয়েকটি দেশ প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে তিনি বলেন, শুধু স্বীকৃতি দেওয়া এই সংকটের সমাধান করতে পারে না।
তিনি বলেন, “এক বছর আগে, এই একই সভাকক্ষে, প্রায় এক ডজন দেশ প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আমি কিছু মানুষের মন্তব্য শুনতে পাই যে, ‘‘স্বীকৃতি তো শুধু একটি কাগজের টুকরো, বাস্তব পরিস্থিতির দিকে তাকান।’”
“কিন্তু গাজার পরিস্থিতির মুখে আমরা যদি নিষ্ক্রিয়ই থেকে যাই, তাহলে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়? কেউ কেউ তথাকথিত শান্তি নিয়ে গর্ব করছেন। কিন্তু সেই শান্তি এক সেকেন্ডের জন্যও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ খুলে দেয়নি। তাহলে কি আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমন এক দৃশ্য দেখব, যা আমাদের সকলের জন্য লজ্জার হওয়া উচিত?”
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, “এক বছর আগে, যখন আমি এই সভাকক্ষে বিশ্বের মহান নেতাদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলাম, তখন গাজায় যুদ্ধ ভয়াবহভাবে চলছিল। কয়েক সপ্তাহ পরেই আমরা গাজার যুদ্ধ শেষ করি, যার ফলে অগণিত হাজার মানুষের জীবন রক্ষা পায়।”
ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক নিয়ে সতর্কবার্তা ম্যাকরঁর:
ম্যাকরঁ দখলকৃত ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেখানে লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, “ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে কী ঘটছে, তা দেখুন। সেখানে প্রতিদিন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। কার নামে? ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে হামাস কখনও সক্রিয় ছিল না।”
“সেখানে যা ঘটছে, তা প্রতিদিন এমন একটি প্রকল্পের সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তুলছে, যে প্রকল্পের ভিত্তি হওয়া উচিত অস্তিত্বের ক্ষেত্রে প্যালেস্তিনীয় জনগণের বৈধ অধিকারের প্রতি সম্মান।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ইজরায়েলের প্রতিবেশী দেশগুলির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে তার নিরাপত্তা আরও উন্নত হবে না। ম্যাকরঁ বলেন, “এগুলি আজ এবং ভবিষ্যৎ—উভয় ক্ষেত্রেই ইজরায়েলের নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।”
‘রাষ্ট্রসংঘ দীর্ঘজীবী হোক’:
আগামী বছর পদ ছাড়ার আগে রাষ্ট্রসংঘে তাঁর শেষ ভাষণে ম্যাকরঁ তথাকথিত “জঙ্গলের আইন”-এর প্রত্যাবর্তনের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, “খুব সহজ ভাষায় আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি রাখা হয়েছে, তা হল—আমরা কি এই স্বাভাবিক অবস্থায়, এক ধরনের জঙ্গলের আইনে ফিরে গিয়ে বাঁচতে চাই, নাকি একটি সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজে বসবাস করতে চাই?”
“আমার বার্তা হল দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিন। যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন না… পরাজয়ের সেই বাগাড়ম্বর, যা সাম্রাজ্যগুলির ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ করে দিচ্ছে এবং কিছু দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।”
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গে ম্যাকরঁ অসামরিক ও জ্বালানি পরিকাঠামোর উপর হামলার ক্ষেত্রে একটি স্থগিতাদেশের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমরা অসামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন দেখেছি। এটি বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের এক নতুন যুগ।”
“আমাদের অবশ্যই সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে হবে। আর সেই কারণেই আমরা দ্বৈত স্থগিতাদেশের প্রতি আমাদের সমর্থন জানাতে চাই—জ্বালানি ও অসামরিক পরিকাঠামোর উপর হামলা বন্ধ রাখার জন্য একটি স্থগিতাদেশ।”
ম্যাকরঁ তাঁর ভাষণ শেষ করেন রাষ্ট্রসংঘের ব্যবস্থার প্রতি স্পষ্ট সমর্থন জানিয়ে। তিনি বলেন, “আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি আমাদের কর্তব্য হল রাষ্ট্রসংঘের পাশে দাঁড়ানো। কেউ কেউ যে দায়মুক্তির নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছেন, তা আমরা মেনে নিতে পারি না।”
তিনি শেষে বলেন, “রাষ্ট্রসংঘ দীর্ঘজীবী হোক!”