গত কয়েক মাস ধরে আমেরিকার এই ‘বিশেষ ছাড়’-এর কারণে ভারত সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় তেল সংকটের মধ্যেও কোনওভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিল। কিন্তু এবার সেই সুযোগের মেয়াদ শেষ! রবিবার,১৭ মে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়া থেকে সমুদ্রপথে আসা অপরিশোধিত তেলের উপর থাকা নিষেধাজ্ঞার ছাড়ের মেয়াদ বাড়ায়নি। কাগজে-কলমে বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও, ভারতের জন্য এর প্রভাব খুবই বড়।
মধ্যাপ্রাচ্যের অশান্তির জেরে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি টালমাটাল! স্ট্রেট অব হরমুজে অবরোধ এখনও অব্যাহত! তেলবাহী জাহাজ চলাচল ধীর হয়ে গিয়েছে। বিমার খরচ বেড়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সংঘাতপূর্ব সময়ে যেখানে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭২ ডলার ছিল, তা এখন ১০৫ ডলারেরও বেশি হয়ে গিয়েছে। এখন ভারত দুই দিক থেকে চাপে পড়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ অনিশ্চিত, অন্যদিকে রাশিয়ার তেলে ‘ছাড়পত্র’ শেষ!
এর মধ্যেই কয়েক দিন আগে ভারতে জ্বালানির দাম প্রায় ৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখন নীতিনির্ধারক মহল, তেল বাজার এবং বড় বড় সংস্থার কর্পোরেট দফতরে একটাই প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে… ভারতের হাতে আর কী কী বিকল্প বাকি আছে? প্রায় দু’বছর ধরে কম দামে পাওয়া রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতের জন্য মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানোর বড় ভরসা হয়ে উঠেছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমি দেশগুলি যখন মস্কোর সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে দেয়, তখন ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা অনেক বাড়িয়ে দেয়। লাভের হিসাবও ছিল আকর্ষণীয়। রাশিয়ার তেল ছিল সস্তা, পরিবহণও সহজ, আর তেল শোধনাগারগুলিও ভাল লাভ করছিল।
ধীরে ধীরে রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়। তার পর শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। পারস্য উপসাগর ও স্ট্রেট অব হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা বাড়তেই বিশ্ব তেল বাজারে চাপ দ্রুত বেড়ে যায়। আশঙ্কা তৈরি হয় যে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে তেল সরবরাহে বাধা আসতে পারে।
ঠিক তখনই আমেরিকা অস্থায়ীভাবে কিছুটা ছাড় দেয়। এই বিশেষ ছাড়ের ফলে, আগে থেকেই জাহাজে তোলা রাশিয়ার তেল কিনলেও দেশগুলিকে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছিল না। ভারত এই ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য জোরালভাবে চাপ দিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়াও একই দাবি জানায়।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে কিছু সময়ের জন্য আমেরিকা এই ছাড় মেনে নিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকার ভিতরে রাজনৈতিক চাপ বাড়তেই থাকে। আমেরিকার আইনপ্রণেতা এবং ইউরোপের বন্ধু দেশগুলি অভিযোগ তোলে, এই ছাড়ের ফলে রাশিয়া আরও বেশি অর্থ উপার্জন করছে, যখন পশ্চিমি দেশগুলি ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখতে চাইছে।
শেষ পর্যন্ত রবিবার সেই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এর ফলে ভারতের তেল শোধনাগারগুলির ছবি এক রাতের মধ্যেই বদলে গিয়েছে। ভারতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল অতিরিক্ত নির্ভরতা। ভারত তার মোট তেলের চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করে। তাই তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি খরচ, সাধারণ মানুষের সংসারের বাজেট এবং দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উপর।
আর এই ছাড়ের সময়ে ভারত রাশিয়ার তেলের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। Kpler data অনুযায়ী, মে মাসে ভারত প্রতিদিন রেকর্ড ২৩ লক্ষ ব্যারেল রাশিয়ার তেল আমদানি করেছে। কিছু মাসে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকই এসেছে রাশিয়া থেকে।
কারণটা সহজ। রাশিয়ার সস্তা তেল বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার ধাক্কা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। সেই ছাড় না থাকলে হিসাবটা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। যদি নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ভারতীয় সংস্থাগুলি রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়ে দেয়, তাহলে তাদের আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির দিকে ফিরতে হবে। কিন্তু সেই অঞ্চলও এখন অস্থির, আর তেলের দামও দ্রুত বাড়ছে।
এর ফলে ভারতের তেল আমদানির খরচ অনেক বেড়ে যেতে পারে। আর তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়ে। পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ে। বিমানভাড়া বাড়ে। পরিবহণ খরচ বাড়ে। খাদ্যদ্রব্যের দামও বাড়তে শুরু করে। সবকিছুর দাম একসঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে যায়।