Last Updated:
Howrah News: বয়স ৬০ কোটায়, মাথায় ৩০ লক্ষ টাকার বোঝা, অদম্য জেদ ও ইচ্ছাশক্তির কাছে হার না মেনে নতুন বাস নিয়ে পথে নেমেছেন ডলি রানা৷ বাস কন্ডাক্টার ডলির কাহিনি জানলে কুর্নিশ জানাবেন৷
হাওড়া, রাকেশ মাইতি: নতুন লড়াইয়ে বাস কন্ডাক্টর ডলি রানা! ষাট ছুঁই ছুঁই বয়সী ডলি বহু মহিলার অনুপ্রেরণা। হার মানা নয়, যেকোনও পরিস্থিতি থেকে নিজের স্বপ্ন পূরণের দিকে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর মূল লক্ষ্য। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার, বাবার স্বপ্ন ছিল নিজের নামে যদি একটা বাস থাকত! ছেলেমেয়েদের কাছে তিনি সেই স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার সে কথা ভাই-বোনদের আর কারও মনে দাগ কাটতে পারেনি। যে পরিবারে খেয়ে-পরে সংসার চালানোর পর উল্লেখযোগ্য কোনও সঞ্চয় থাকে না, সেই পরিবারে এমন স্বপ্ন দেখা সত্যিই বেমানান। তবে বৃদ্ধ বাবার সেই স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসেন বড় মেয়ে। নিজের গয়না ও জমানো টাকা—সর্বস্ব দিয়ে এবং ঋণ নিয়ে প্রায় ৭ লক্ষ টাকায় বাস কিনে বাবার স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন তিনি।
সে সময় বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে নেমে তাঁর জীবনে যে কঠিন লড়াই অপেক্ষা করছে, তা কিছুটা আন্দাজ তিনি আগেই করেছিলেন। কারণ, বাস কিনে রুটে চালানো মোটেও সহজ কাজ নয়। যে ব্যবসায় পুঁজিপতিরা হিমশিম খায়, সেখানে একজন ঘরোয়া মহিলা কতটা সফল হবেন, সে বিষয়ে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস এবং লড়াই করার জেদ তাঁকে এগিয়ে রাখে। চালক ও কন্ডাক্টর দিয়ে রুটে বাস চালানোর পর ২-৩ বছর কেটে যায়। তবে যত সময় গড়িয়েছে, ব্যবসার হিসেবের অঙ্ক তত নিখুঁত করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু সব পরিকল্পনা ও ধারণাকে ওলটপালট করে দেয় ভয়ঙ্কর লকডাউন পরিস্থিতি।
কয়েক বছর কাটতে না কাটতেই লকডাউন শুরু হয়। টানা বেশ কিছুদিন বাস পরিষেবা বন্ধ থাকে। এরপর বাস চালানোর ছাড়পত্র মিললেও রাস্তায় পর্যাপ্ত যাত্রী ছিল না। ফলে চালক ও কন্ডাক্টর রেখে বাস চালানো আর্থিকভাবে লোকসান এনে দিচ্ছিল। পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেয় যখন দিনশেষে চালক-কন্ডাক্টরের পারিশ্রমিক দিয়ে বাসে তেল ভরার টাকাও অবশিষ্ট থাকত না। তবে কি স্বপ্নের সেই বাসটি বন্ধ হয়ে যাবে? এমন এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। পরিবারের সকলেই তখন দারুণ চিন্তিত। সেই সময় হেঁশেল ছেড়ে, নারী হয়েও টিকিট এবং খুচরো টাকার ব্যাগ হাতে বাসের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি।
কয়েক বছর আগে প্রথমবার যখন বাস কন্ডাক্টরের ব্যাগ হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তখন যতটা লজ্জিত বা ইতস্তত বোধ করেছিলেন, তার চেয়ে ঢের বেশি কষ্টের ছিল টানা নয় মাস গৃহবন্দী থাকা—জানিয়েছেন ডলি রানা। সহকর্মী বাস চালক ও কন্ডাক্টররা প্রায়ই খোঁজ নিতেন, “আবার কবে বাস নিয়ে পথে নামছেন ডলি দি?” নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে নতুন বাস কিনে রুটে নামানো সহজ কথা নয়, আর এতে ঝুঁকিও কম নেই। কিন্তু এবারও সেই ঝুঁকি নিয়েই পথে নেমেছেন তিনি। পথ একই, পেশাও এক, শুধু নতুন এক লড়াইয়ে নেমেছেন হাওড়ার মহিলা বাস কন্ডাক্টর ডলি রানা। এবার তিনি মাথার উপর প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে নতুন বাস নামিয়েছেন রুটে। নিজের স্থির লক্ষ্য, কঠোর পরিশ্রম আর হার না মানা জেদ নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। আগামী ছয় বছরে সমস্ত ঋণ শোধ করে, একাধিক বাসের মালিক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন ডলি রানা।
এ প্রসঙ্গে ডলি রানা জানান, হেরে যাওয়া নয়, নিজের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাওয়ার নামই জীবন। নিজের স্বপ্নকে সামনে রেখেই এগিয়ে চলেছেন তিনি। প্রতিদিন ভোর ৪টে ঘুম থেকে উঠে চালক ও খালাসিকে (হেলপার) ডেকে, কন্ডাক্টরের ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তারপর দিন শেষে রাতে বাড়ি ফেরা। তিনি আরও জানান, আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে এখন সাক্ষাৎ কমেছে, সামাজিক অনুষ্ঠানবাড়িতেও যোগদান নেই বললেই চলে। তবে আত্মীয়তা বেড়েছে নিত্যযাত্রীদের সঙ্গে। নিজের কর্মক্ষেত্রে শতভাগ অবদান বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। যতদিন হাত-পা চলবে, ততদিন এভাবেই তিনি নিজের বাসের দরজায় ব্যাগ হাতে দাঁড়াবেন। এই কাজে যেমন পরিশ্রম রয়েছে, তেমনই রয়েছে দারুণ মানসিক তৃপ্তি।
Kolkata,West Bengal
Howrah News: এ যেন হার না মানা লড়াই! বয়স ৬০-ছুঁই ছুঁই, ৩০ লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা, স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে বাস নিয়ে পথে নেমেছেন কন্ডাক্টার ডলি