নয়াদিল্লি: নেতৃত্বের প্রশ্নে টাটা গোষ্ঠীর অন্দরে জট কি আরও বাড়ল? বৃহস্পতিবার বোর্ড মিটিংয়ের পর আবারও প্রশ্ন উঠতে শুরু করল। কারণ টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে আরও পাঁচ বছরের জন্য এন চন্দ্রশেখরনকেই চেয়ারম্যান দেখতে চায় বোর্ড। কিন্তু চন্দ্রশেখরনের মেয়াদবৃদ্ধির তীব্র বিরোধিতা করেছেন টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা। শুধু তাই নয়, RBI-এর নির্দেশ মেনে বাজারে নাম নথিভুক্তিকরণ নিয়েও মতবিরোধ তীব্র হয়ে উঠল। (Tata Sons Hurdle)
বৃহস্পতিবার বৈঠক চলাকালীন টাটা সন্সের বোর্ড-সদস্যরা আরও পাঁচ বছরের জন্য চন্দ্রশেখরনের মেয়াদবৃদ্ধির পক্ষে সওয়াল করেন। নোয়েলের আপত্তি অগ্রাহ্য করেই মেয়াদবৃদ্ধির প্রস্তাবে অনুমোদন মেলে। শুধু তাই নয়, RBI-এর নির্দেশ মেনে শেয়ার বাজারে সংস্থার IPO আনাতেও সম্মতি জানান বোর্ড-সদস্যরা। তবে অনুমোদন মিললেও, এখনও পর্যন্ত কিছু চূড়ান্ত হয়নি। টাটা সন্সের বার্ষিক সাধারণ সভা বা AGM-এ অনুমোদন পেতে হবে। কিন্তু টাটা সন্সের ৬৬ শতাংশ মালিকানা টাটা ট্রাস্টসের হাতে। ফলে জোর সংঘাত দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। (Tata Group Inner Tussle)
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, টাটা সন্সের বোর্ডে টাটা ট্রাস্টসের দুই মনোনীত প্রতিনিধি রয়েছেন, বেণু শ্রীনিবাসন এবং নোয়েল। নোয়েলের সঙ্গে বাকিদের মতবিরোধ দেখা দিলেও, চন্দ্রশেখরনের কার্যকালের মেয়াদবৃদ্ধি এবং শেয়ার বাজাের টাটা সন্সের নাম নথিভুক্তির প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছেন শ্রীনিবাসন। AGM বৈঠকে যদি দুই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভেটো জমা পড়ে, সেক্ষেত্রে কোম্পানি আইনে সবকিছু আটকে যাবে। সর্বসম্মতি না মেলায় পাঁচ মাস আগে চন্দ্রশেখরনের কার্যকালের মেয়াদবৃদ্ধির প্রস্তাব আটকে গিয়েছিল।
এর আগে, অগাস্ট মাসে চন্দ্রশেখরন জানিয়ে দিয়েছিলেন, ২০২৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ ফুরনোর পর আর টাটা সন্সের চেয়ারম্যান থাকতে আগ্রহী নন তিনি। অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের বৈঠকের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। চন্দ্রশেখরনের মেয়াদবৃদ্ধির বিষয়টি সরাসরি শেয়ার হোল্ডারদের হাতে এখন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্মিলিত ভাবে টাটা সন্সের ৬৬ শতাংশ মালিকানা রয়েছে টাটা ট্রাস্টসের হাতে। ইতিহাস বলছে, টাটা সন্সের উপর তাদের প্রভাব রয়েছে বিরাট। এই মুহূর্তে চন্দ্রশেখরনকে নিয়ে যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে, তাতে টাটা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসছে।
আরও পড়ুন: UPI লেনদেনে ফি, বাড়তি ১৫০০০-২০৬০০ কোটি টাকা আয়ের সুযোগ, লাভবান হবে কারা?
এর আগেও, টাটা গোষ্ঠীর অন্দরে বার বার মতবিরোধ ঘটেছে। তবে এতদিন মতবিরোধ ছিল মূলধন বরাদ্দ, সংস্থার তালিকাভুক্ত নয় এমন কিছু ব্যবসার লোকসান এবং ভবিষ্য়ৎ কাঠামো নিয়ে। টাটা গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত নয় এমন আটটি সংস্থার বিপুল ক্ষতি হয়েছে ইতিমধ্যেই, প্রায় ৩৩ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার। এর মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার ক্ষতির পরিমাণ ২২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা, টাটা ডিজিটালের ৪ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা।
যে সময় টাটা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসে পড়েছে, তাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অতি সম্প্রতিই প্রাইভেট সংস্থা হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার যে আবেদন জমা দিয়েছিল টাটা সন্স, তা খারিজ করে দিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। নিয়ম মেনে শেয়ার বাজারে নাম নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে বলা হয়। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে IPO-র সমর্থনেই ভোট দিয়েছেন বোর্ড-সদস্যরা। এমনকি IPO নিয়ে বিভাজন চোখে পড়ছে টাটা ট্রাস্টসের অন্দরেও। নোয়েল এবং টাট সন্সের কিছু প্রাক্তন ডিরেক্টর যেখানে IPO-র বিরোধিতা করছেন, শ্রীনিবাসন, বিজয় সিংহ-সহ অন্যরা সমর্থন করছেন। টাট সন্সে ১৮.৩৭ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকা শাপুরজি পালোঞ্জি গ্রুপও IPO-র পক্ষে।
গত ১৮ অগাস্ট AGM হওয়ার কথা ছিল এর আগে। কিন্তু রতন টাটা ট্রাস্টের তরফে সেভাবে প্রতিনিধিত্ব না থাকায়, সেটি স্থগিত রাখতে হয়। টাটা সন্সের ২৩.৫৬ শতাংশের অংশীদার রতন টাটা ট্রাস্ট। বিধিনিষেধের জেরে তারা প্রতিনিধি মনোনয়নের বিষয়টি সম্পন্ন করতে পারেনি সেই সময়। তাই AGM-এর সিদ্ধান্তের দিকে এখন তাকিয়ে সকলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে টাটা সন্সের সামনে তিনটি চ্যালেঞ্জ, ১) চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্ব, ২) RBI-এর নির্দেশ মেনে লিস্টিং, ৩) টাটা ট্রাস্টসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। AGM-এ ভোটে দিয়ে সব কিছুর বিরোধিতা করতেই পারে টাটা ট্রাস্টস। কিন্তু সেখানেও বিভাজন দেখা গিয়েছে। ফলে নোয়েল চাইলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।