স্টার ওয়ার্স, ‘দ্য মার্সিয়ান’-এর মতো সিনেমায় যে ধরনের মহাকাশযুদ্ধ দেখা যায়, বাস্তবে এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছয়নি পৃথিবী। তবে মানুষের তৈরি অস্ত্র মহাকাশে পৌঁছে গিয়েছে। আধুনিক যুদ্ধকৌশলে মহাকাশ কি তবে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? সম্প্রতি, আমেরিকা জানিয়েছে, মহাকাশে পাকাপাকি ভাবে অস্ত্র রেখেছে তারা, যা নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৃথিবীর চারপাশে স্যাটেলাইটের মতো ঘুরছে৷
বিভিন্ন দেশের হাতে থাকা ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ICBM উৎক্ষেপণের পরে তা বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে কিছু সময়ের জন্য মহাকাশে প্রবেশ করে। তারপরে মহাকাশের একটি অংশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ফের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এই কারণেই ICBM-কে মাঝপথে শনাক্ত করে প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু, এবার যে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে, তা হল—মহাকাশে অস্ত্রকে আগে থেকেই কক্ষপথে পাঠিয়ে রাখা।
আমেরিকার বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় মেইনক জানিয়েছেন, আমেরিকা মহাকাশে পাকাপাকিভাবে অস্ত্র পাঠিয়েছে। সেই অস্ত্র স্যাটেলাইটের মতো কক্ষপথে ঘুরছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে অস্ত্রটির প্রকৃতি বা ঠিক কীভাবে সেটি ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। জাতীয় নিরাপত্তার কারণেই আমেরিকা এই তথ্য গোপন রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কক্ষপথে থাকা কোনও অস্ত্র প্রয়োজনের সময় পৃথিবীর নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে পাঠানো সম্ভব হলে, তা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ মাটি, বিমান, জাহাজ কিংবা অন্য কোনও প্ল্যাটফর্ম থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রকে রাডারে শনাক্ত করার সুযোগ থাকে। কিন্তু কক্ষপথ থেকে নেমে আসা কোনও অস্ত্রকে শনাক্ত ও প্রতিহত করার মতো রাডার এখনও তৈরি হয়নি।
আমেরিকার অবশ্য দাবি, মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের উদ্দেশ্য অন্য কোনও দেশের ক্ষতি করা নয়, বরং নিজেদের মহাকাশসম্পদ রক্ষা করা। কারণ, বর্তমানে একটি দেশের সামরিক ও বেসামরিক পরিকাঠামোর সঙ্গে স্যাটেলাইট ব্যবস্থা গভীরভাবে যুক্ত। যোগাযোগ, নেভিগেশন, আবহাওয়া, সামরিক নজরদারি থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কিং ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো বহু ক্ষেত্রেই স্যাটেলাইটের ভূমিকা রয়েছে। ফলে কোনও দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট অচল করে দিতে পারলে সরাসরি মাটিতে হামলা না করেও সেই দেশের পরিকাঠামোয় বড় ধরনের প্রভাব ফেলা সম্ভব।
১৯৮৫ সালে আমেরিকা মাটি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে একটি পুরনো স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছিল। পরবর্তীকালে চিন ও রাশিয়াও অ্যান্টি-স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ভারতও ২০১৯ সালে ‘মিশন শক্তি’-র মাধ্যমে অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ব্যবহার করেছে। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা একটি স্যাটেলাইটকে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করার সক্ষমতা দেখিয়েছিল ভারত।
পরে মহাকাশের নিরাপত্তাকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে আমেরিকা ২০১৯ সালে পৃথক Space Force-ও তৈরি করে ফেলেছে। মহাকাশে আমেরিকার সম্পদ ও স্বার্থ রক্ষা করাই এই বাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আমেরিকার মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের খবর সামনে আসতেই চিন সতর্ক করেছে, মহাকাশকে যেন যুদ্ধের ক্ষেত্র বা সংঘাতের ময়দানে পরিণত করা না হয়। শীতযুদ্ধের সময় ১৯৬৭ সালে আমেরিকা, ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তি হয়েছিল। মহাকাশে কেউ গণবিধ্বংসী অস্ত্র যেমন পরমাণু বোমা রাখবে না। এবং একটা সমঝোতা হয়েছিল, যে মহাকাশকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু, আমরা তো দেখেছি স্পাই স্যাটালাইটগুলোকে যুদ্ধের সময় শত্রুর গতিবিধি বুঝতে ব্যবহার করা হয়। সকলেই করে। আর উনিশশো সাতষট্টি সালে শুধু গণবিধ্বংসী অস্ত্র না রাখার কথা বলা হয়েছিল। কোনও অস্ত্রই রাখা যাবে না, সেকথা বলা হয়নি। দ্বিতীয়ত মহাকাশের জন্য আলাদা কমান্ড বা বাহিনী তৈরি করা যাবে না, সেকথাও বলা হয়নি। তাই আমেরিকা আলাদা বাহিনী তৈরি করেছে।
আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে মহাকাশে সবচেয়ে বড় লড়াই হয়তো সরাসরি বোমা বা মিসাইল ছোড়া নয়। বরং প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইট ব্যবস্থা অচল করে দেওয়াই হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। জ্যামিং, সাইবার হামলা কিংবা অ্যান্টি-স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনও দেশের মহাকাশভিত্তিক পরিকাঠামোকে ব্যাহত করা গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে যোগাযোগ, নেভিগেশন, সামরিক ব্যবস্থা, ব্যাঙ্কিং, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবায়।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ২০২২ সালের পর ইউরোপের কয়েকটি স্যাটেলাইটে জ্যামিং এবং তার মাধ্যমে গোপন তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছিল। যদিও এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগ, সন্দেহ এবং নিশ্চিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ফলে মহাকাশে আমেরিকা ঠিক কী অস্ত্র পাঠিয়েছে, শুধু সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসল প্রশ্ন—কে মহাকাশভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তিতে কতটা এগিয়ে এবং প্রতিপক্ষের মহাকাশসম্পদকে কতটা সুরক্ষিত রাখতে বা অচল করতে পারে।
ভারতের মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত। অ্যান্টি-স্যাটেলাইট সক্ষমতার প্রদর্শনও করেছে ভারত। অর্থাৎ ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু স্থল, জল বা আকাশে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মহাকাশও হয়ে উঠতে পারে কৌশলগত প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রশ্ন এখন একটাই—আগামী দিনের যুদ্ধ যদি সত্যিই মহাকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে সেই মহাকাশের মহারণে ভারত কতটা প্রস্তুত?