ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে ছিলেন মোট ১৭৪ জন যাত্রী। তেল আভিভের দিকে যাওয়ার সময় ওমানের নাগরিক বলে দাবি করা সহ-পাইলট আচমকাই ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন এবং বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ।
নিনা তাঁর মাকে সঙ্গে নিয়ে বিমানের সামনের শৌচাগারের দিকে যাচ্ছিল। সেই সময়ই ককপিটের কাছ থেকে চিৎকার ও তীব্র ধস্তাধস্তির শব্দ শুনতে পান তাঁরা।
ইজরায়েলের Channel 12-কে ঘটনার কথা জানাতে গিয়ে নিনা ও তাঁর মা তালির মা বলেন, ককপিটের ভিতরে রক্ত ছড়িয়ে ছিল এবং সেখানে ভয়াবহ লড়াই চলছিল।
তালি সঙ্গে সঙ্গে কেবিন ক্রুদের সতর্ক করার চেষ্টা করেন। তাঁর দাবি, এক পর্যায়ে ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা দিয়ে বাইরে পড়ে যান, তখনও সহ-পাইলট তাঁকে আক্রমণ করছিলেন।
তালি চিৎকার করে বলেন, “ও পাইলটকে ছুরি মারছে, পাইলটকে ছুরি মারছে, সাহায্য করুন!” প্রথমে অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পারেননি। পরে গুরুতর আহত ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর কয়েকজন যাত্রী ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে আটকানোর চেষ্টা করেন।
এর মধ্যেই বিমানটি আচমকা দ্রুত নীচে নামতে শুরু করে। The Sun-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি ১৭,৪০০ ফুট নীচে নেমে যায়।
মেয়ের চিৎকার শুনে ককপিটের দিকে ছুটে যান নিনার বাবা তজভিকা মানেস। The Sun-কে তিনি জানান, বিমান আচমকা নীচে নামার সময় তাঁর মেয়েদের কান্না এখনও তাঁর কানে বাজে।
তাঁর কথায়, মেয়েরা কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, “বাবা, আমরা মরতে চাই না।” মেয়েদের সেই কান্নাই তাঁকে ককপিটের দিকে ছুটে যেতে বাধ্য করে।
এরপর আরও দুই যাত্রীর সঙ্গে ককপিটের দিকে এগিয়ে যান তজভিকা। তাঁরা মিলে অভিযুক্ত সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করেন। বিমানের ভিতরের ভিডিওতেও যাত্রীদের তাঁকে মাটিতে চেপে ধরে রাখতে দেখা যায়। একইসঙ্গে তাঁরা আহত ক্যাপ্টেনকেও সাহায্য করেন।
এই সময় বিমানে থাকা অন্য এক পাইলট বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে ছুটিতে থাকা এক পাইলটও বিমান চালাতে সাহায্য করেন। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় বিমানটিকে।
আহত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের চিকিৎসার জন্য বিমানের যাত্রীরা সাহায্য চান। তজভিকা জানান, বিমানে কোনও চিকিৎসক রয়েছেন কি না জানতে চাওয়া হয়েছিল। তখন একজন চিকিৎসক না থাকলেও এগিয়ে আসেন এক ডেন্টিস্ট।
CNN-কে তজভিকা বলেন, ওই ডেন্টিস্ট ভারতীয় ক্যাপ্টেনের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি স্মিতকে অক্সিজেন দেন, কম্বল ও বিমানে থাকা বিভিন্ন সরঞ্জামের সাহায্যে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
শেষ পর্যন্ত বিমানটি নিরাপদে সৌদি আরবে অবতরণ করে। News18-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানে থাকা ১৭৪ জন যাত্রীর মধ্যে ১৬৬ জনই ছিলেন ইজরায়েলি।
ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং অভিযুক্ত হামলাকারীর পরিচয় ও পটভূমি নিয়ে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্ত সহ-পাইলট ওমানের নাগরিক। যদিও ওমানের কর্তৃপক্ষ তাঁর জাতীয়তা নিশ্চিত করেনি।
অভিযুক্তকে সৌদি আরবে আটক করা হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং ইজরায়েলে এই ঘটনার তদন্ত চলছে।
অভিযুক্ত সহ-পাইলটের কথিত জাতীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও ইজরায়েলের মধ্যে বিমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু Fox-কে জানিয়েছেন, ইজরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই—এমন দেশের নাগরিকদের ক্রু সদস্য হিসেবে ইজরায়েলগামী বিমানে কাজ করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে কীভাবে এই সহ-পাইলট ইজরায়েলগামী বিমানে কাজ করছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মাঝ আকাশে ভয়াবহ হামলার পরও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার এবং তাঁকে সাহায্য করা যাত্রীদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের সঙ্গে কথা বলেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করেন। কথোপকথনের সময় আহত ভারতীয় পাইলট কী ঘটেছিল এবং সেই সংকটময় মুহূর্তে কীভাবে তিনি পরিস্থিতির মোকাবিলা করার সাহস পেয়েছিলেন, তা প্রধানমন্ত্রীকে জানান।