হঠাৎ করে দেশজুড়ে হোটেল রুমের ভাড়া নিয়ে বিস্তর ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। পর্যটকের চাহিদা, পরিকাঠামো এবং বিলাসবহুল হোটেলের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন রাজ্যে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট। সাম্প্রতিক পর্যটন ও বুকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব ভারতের মধ্যে বর্তমানে হোটেল ভাড়ার নিরিখে শীর্ষে রয়েছে ওড়িশা। অনেকের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু সেই অনুপাতে পরিকাঠামো বাড়ানো যায়নি। পুরী ও গোপালপুরের মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে বিশেষ করে উৎসব বা স্কুল কলেজে গরমের ছুটির সময় হোটেলের ভাড়ায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু হালে দেখা যাচ্ছে পুরীতে সাধারণ হোটেলের ঘর ভাড়াও প্রচুর বেড়ে গিয়েছে। বিলাসবহুল ও প্রিমিয়াম হোটেলের কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না।
পুরীর কয়েকটি বিখ্যাত হোটেলের চিত্র যদি দেখা যায়-
সাধারণ মানের হোটেল বা ধর্মশালাগুলোর একসময়ে ভাড়া ছিল ১০০০ টাকা। এখন যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০০ টাকা
স্ট্যান্ডার্ড এসি হোটেল বা লজের ভাড়া ৩০০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬০০০ টাকা
প্রিমিয়াম হোটেল বা রিসোর্টের ভাড়া ৭০০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭,০০০ টাকা
যেমন ধরা যাক, পুরী হোটেল। সাধারণ ঘরের ভাড়া ছিল ২৫০০ টাকা। বেড়ে হয়েছে ৪০০০ টাকা আর ডিলাক্স রুম ছিল ৪০০০ টাকা। বেড়ে হয়েছে ৮০০০ টাকা
ভিক্টোরিয়া হোটেল। সাধারণ ঘরের ভাড়া ছিল ৪৫০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৮০০০টাকা। আর ডিলাক্স রুম ছিল ৮০০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১২,০০০ টাকা
ভক্ত নিবাস। সাধারণ ঘরের ভাড়া ছিল ১৮০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৫০০০ টাকা
সমুদ্রের টান ও ধর্মীয় পর্যটন। সেই সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি। এর জেরেই হোটেল ভাড়ায় এই বাড়বাড়ন্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এই প্রবণতা যেমন ওড়িশার পর্যটন শিল্পে জোয়ার বলে চিহ্নিত হচ্ছে, তেমনই টাকার অঙ্ক পর্যটকদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। পুরীতে এসে ধাক্কা খাচ্ছেন পর্যটকেরা। ক’বছর আগেও যে ঘর তিন থেকে চার হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেই একই ঘরের ভাড়া সাত-আট হাজার ছুঁয়েছে। সমুদ্রের ধারের বহু হোটেলে দাম সাধারণ পর্যটকদের নাগালের বাইরে। বিশেষ করে ছুটির মরশুম, রথযাত্রা কিংবা সপ্তাহের শেষে রুম পাওয়া এখন কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কলকাতা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া একাধিক পরিবারের মতে, “প্রতি বছর পুরী আসি। কিন্তু এবার হোটেলের ভাড়া শুনে সত্যিই অবাক হয়ে গেছি। আগে যে টাকায় দু’রাত থাকা যেত, এখন এক রাতও হচ্ছে না।”
শুধু বিলাসবহুল হোটেল নয়, সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের লজ কিংবা ছোট হোটেলগুলির ভাড়াও বেড়েছে অনেকটা। সমুদ্রের একেবারে সামনে থাকা হোটেলগুলির দাবি, চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। আসলে গত কয়েক বছরে পুরীর ছবিটাই বদলে গেছে। জগন্নাথ মন্দির করিডোর প্রকল্প, সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্যায়ন, নতুন রাস্তা, উন্নত রেল যোগাযোগ, সব মিলিয়ে পর্যটকের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, এখন দিল্লি, মহারাষ্ট্র, গুজরাত থেকেও প্রচুর পর্যটক আসছেন। তার উপর বিমান পরিষেবার উন্নতি পুরীকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, এই বাড়তি ভিড়ই হোটেলের দামের মূল কারণ। অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্মে আগেভাগেই অধিকাংশ রুম বুক হয়ে যাচ্ছে। ফলে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ভাড়াও। অন্যদিকে, হোটেল মালিকদের দাবি, বিদ্যুতের খরচ, কর্মচারীদের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ সবকিছুর খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। পুরীর এক হোটেল ব্যবসায়ী বলছিলেন, “এখন পর্যটকের প্রত্যাশাও বদলেছে। আগে শুধু একটা ঘর হলেই চলত। এখন সবাই চাইছেন সুইমিং পুল, সি-ভিউ, আধুনিক সুবিধা। সেই পরিষেবা দিতে গেলে খরচও বাড়ে।”
শুধু পুরী নয়, ওড়িশার গোপালপুরের মতো সৈকত শহরেও একই ছবি। সেখানে সমুদ্রের ধারের রিসর্টগুলির ভাড়া এখন অনেক সময় ছ’হাজার টাকারও বেশি। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, ওড়িশা এখন পূর্ব ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। আর সেই জনপ্রিয়তার প্রভাবই পড়ছে হোটেল ভাড়ায়। তবে এই বাড়তি খরচ চিন্তায় ফেলছে মধ্যবিত্ত পর্যটকদের। অনেকেই এখন সমুদ্রের ধারে হোটেলে থাকার বদলে শহরের ভিতরের হোটেল বেছে নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার পুরীর পরিবর্তে দিঘা বা অন্য সস্তার গন্তব্যের খোঁজ করছেন। তবু পুরীর টান কমেনি। সন্ধ্যায় সমুদ্রের ধারে ঢেউ ভাঙার শব্দের মধ্যে এখনও হাজার হাজার মানুষ ছুটি কাটাচ্ছেন। শুধু বদলেছে হিসেবটা। আগে পুরী ছিল কম খরচে আনন্দের ঠিকানা। এখন সেই পুরী ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে দামি পর্যটন শহর।