স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে নেহরুর শাসনব্যবস্থা মূলত প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রনির্ভর পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। নবস্বাধীন দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের কাঁধেই ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গত ১২ বছরের শাসনকালে বারবার উঠে এসেছে ‘জন ভাগীদারি’ বা জনগণের অংশগ্রহণের ধারণা। স্বচ্ছ ভারত অভিযান, ডিজিটাল পেমেন্ট, জল সংরক্ষণ, টিকাকরণ কর্মসূচি-সহ একাধিক প্রকল্পকে জনআন্দোলনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে কেন্দ্র সরকার। এর কেন্দ্রে ছিল ‘সবকা প্রয়াস’— অর্থাৎ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ভাবনা।
নেহরুর সময়ে উন্নয়নকে মূলত সরকারের দায়িত্ব হিসেবে দেখা হলেও, মোদি সরকারের যুক্তি ছিল ভিন্ন। ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশে শুধুমাত্র সরকারি যন্ত্রের উপর নির্ভর করে স্যানিটেশন, জল সংরক্ষণ, ডিজিটালাইজেশন বা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো বৃহৎ লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই নাগরিকদের শুধু সুবিধাভোগী নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
স্বচ্ছ ভারত মিশন এই দর্শনের অন্যতম বড় উদাহরণ। সরকার শৌচাগার নির্মাণ ও স্যানিটেশন অবকাঠামো গড়ে তুললেও, এই কর্মসূচিকে সফল করতে সাধারণ মানুষ, পড়ুয়া, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, আবাসন সমিতি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। পরিচ্ছন্নতাকে শুধুমাত্র সরকারি প্রকল্প নয়, ‘জন আন্দোলন’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। একইভাবে জল শক্তি অভিযান এবং ‘ক্যাচ দ্য রেইন’ কর্মসূচিতেও স্থানীয় সম্প্রদায়, পঞ্চায়েত, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ এবং জল রক্ষার কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। এই প্রচারাভিযানগুলিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও কেন্দ্র সরকার টিকাকরণ কর্মসূচিতে জনসাধারণের অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। নাগরিকরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করেন, স্বেচ্ছাসেবীরা সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা নেন এবং স্থানীয় স্তরে বিভিন্ন প্রচারাভিযান পরিচালিত হয়। টিকাকরণ, মাস্ক ব্যবহার এবং কোভিড-উপযুক্ত আচরণে প্রশাসনিক কঠোরতার পাশাপাশি জনসচেতনতার উপরও সমান জোর দেওয়া হয়। সরকারি নীতি নির্ধারণ ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে ‘মাইগভ’ প্ল্যাটফর্মও চালু করা হয়েছে, যেখানে নাগরিকরা বিভিন্ন নীতি, কর্মসূচি এবং প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে মতামত ও পরামর্শ দিতে পারেন। একইভাবে ফিট ইন্ডিয়া, আন্তর্জাতিক যোগ দিবস, ‘ভোকাল ফর লোকাল’ এবং মিলেট প্রচারের মতো উদ্যোগগুলিও মূলত জনঅংশগ্রহণ ও আচরণগত পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল।
প্রধানমন্ত্রী মোদির শাসন মডেলের সমর্থকদের মতে, এই পদ্ধতি নাগরিকদের কেবল সরকারি সুবিধার গ্রহীতা হিসেবে নয়, বরং দেশের উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। পরিচ্ছন্নতা, জল সংরক্ষণ, ডিজিটাল পেমেন্ট, যোগচর্চা, স্থানীয় উৎপাদন এবং মিলেট ব্যবহারের মতো ক্ষেত্রগুলিতে জনসম্পৃক্ততাকে নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছে। আগামী ১০ জুন নেহরুর প্রধানমন্ত্রিত্বের রেকর্ড অতিক্রম করার প্রাক্কালে এই তুলনা ভারতের শাসনব্যবস্থার দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে নিয়ে আসে— একদিকে রাষ্ট্রনির্ভর উন্নয়নের মডেল, অন্যদিকে এমন একটি মডেল যেখানে সরকার নাগরিকদের জাতীয় উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে।