Last Updated:
East Bardhaman News: কাটোয়ার বহু মানুষ আজ শঙ্করকে চেনেন। দোকানদার থেকে সাধারণ মানুষ, এমনকি বিভিন্ন সরকারি অফিস ও থানার কর্মীরাও তাঁকে স্নেহ করেন। কারণ শঙ্কর কখনও কারো করুণা চান না। তিনি চান শুধু নিজের পরিশ্রমের বিনিময়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে। চাঁদের পাহাড়ের শঙ্কর যেমন সাহস আর সংগ্রামের প্রতীক, তেমনই কাটোয়ার এই শঙ্করও নীরব এক লড়াইয়ের নাম। যে লড়াই শেখায় জীবনে যত বাধাই আসুক, হার না মেনে এগিয়ে যাওয়ার নামই বেঁচে থাকা।
কাটোয়া, পূর্ব বর্ধমান, বনোয়ারীলাল চৌধুরী: চাঁদের পাহাড়ের শঙ্করের গল্প অনেকেই জানেন, এবার জানুন কাটোয়ার শঙ্করের গল্প। কানে শুনতে পান না, মুখে কথাও বলতে পারেন না। জীবনের একের পর এক আঘাতে ভেঙে পড়ার যথেষ্ট কারণ ছিল তাঁর। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন। পরে সংসারও ভেঙেছে। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন। বাড়িতে রয়েছেন অসুস্থ বৃদ্ধা মা। তবুও হার মানেননি কাটোয়া শহরের আদর্শপল্লির বাসিন্দা শঙ্কর দেবনাথ।
প্রতিদিন বিকেল চারটের পর একটি সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সাইকেলের সামনে ঝোলানো থাকে একটি বোর্ড। সেখানে লেখা থাকে তিনি কথা বলতে পারেন না, কানে শুনতেও পান না। অসুস্থ মায়ের ওষুধ ও সংসারের খরচ চালাতে ধূপকাঠি বিক্রি করেন। সেই বোর্ডই যেন তাঁর ভাষা, তাঁর পরিচয়। গত পাঁচ বছর ধরে কাটোয়া শহরের বিভিন্ন এলাকা, দোকান ও পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ধূপকাঠি বিক্রি করছেন শঙ্কর। কথার বদলে হাতের ইশারায় নিজের প্রয়োজন বোঝান। আর মানুষও তাঁকে বুঝে নেয়। কারণ তাঁর পরিচয় একজন প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে নয়, একজন পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে। শঙ্করের জামাইবাবু সুব্রত রায় জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী।
সংসারের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কখনও অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকতে চাননি। বরং নিজের পরিশ্রমে বৃদ্ধা মায়ের ওষুধের খরচ জোগানোর চেষ্টা করে চলেছেন। দিন শেষে কখনও ১৫০, কখনও ২০০ টাকা আয় হয়। সেই সামান্য উপার্জনই তাঁর কাছে অনেক বড়।

স্ত্রী ও মেয়ে চলে যাওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন শঙ্কর। তখনই পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ধূপকাঠি বিক্রির কাজে যুক্ত করেন। কাজের মধ্যেই ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে সামলে তুলেছেন। এখন একদিন বাড়িতে বসে থাকতে বললেও রাজি হন না। তাঁর একটাই কথা দুটো ধূপকাঠি বেশি বিক্রি হলে মায়ের জন্য ওষুধ কেনা যাবে। শঙ্করের দিদি সাবিত্রী রায়ও ভাইয়ের এই মানসিকতার প্রশংসা করেন।
তাঁর কথায়, ‘‘আমরা অনেকবার বলেছি বাড়িতে থাকতে, কিন্তু ও কখনও বসে খাওয়ার মানুষ নয়। সব সময় ভাবে, বৃদ্ধা মায়ের জন্য কিছু করতে হবে।’’
তবে প্রতিদিনের পথচলা সহজ নয়। কানে শুনতে না পাওয়ায় রাস্তায় গাড়ির হর্ন শুনতে পান না। অনেক সময় দুর্ঘটনার মুখেও পড়তে হয়। তবুও থেমে যান না তিনি। কারণ তাঁর কাছে পরিশ্রমই জীবনের ভরসা।
Barddhaman,West Bengal