কোন কোন ভোটে এক্সিট পোল ব্যর্থ প্রমাণিত হয়?
লোকসভা নির্বাচন: ২০০৪ ও ২০২৪
২০০৪: এক্সিট পোলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে ধরা হয় ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনকে। “ইন্ডিয়া শাইনিং” প্রচারের জোরে প্রায় সব বড় সমীক্ষা সংস্থা অটল বিহারী বাজপেয়ী নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র সহজ জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল।
অনেকেই মনে করেছিল এনডিএ ২৪০-২৫০টি আসন পাবে। কিন্তু বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়—এনডিএ থেমে যায় ১৮১-এ, আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ বৃহত্তম জোট হিসেবে উঠে এসে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে।
২০২৪: দুই দশক পরেও ভারতীয় ভোটাররা বিশেষজ্ঞদের চমকে দিয়েছেন। অধিকাংশ সমীক্ষা সংস্থা বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র বড় জয়ের পূর্বাভাস দেয়, এমনকি ‘৪০০ পার’ করার লক্ষ্যকেও সম্ভব বলে মনে করা হয়।
অনেক বুথফেরত সমীক্ষার পূর্বাভাসে এনডিএ-কে ৩৫০-৪০০ আসনের মধ্যে রাখা হলেও, বাস্তবে তারা পায় ২৯৩টি আসন। বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ২৪০ আসনে থামে। বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট ২৩৪টি আসন পেয়ে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ভালো ফল করে।
বিধানসভা নির্বাচনেও বড় ভুল
২০১৫ বিহার
বিহারের নির্বাচনে ‘মহাগঠবন্ধন’— নীতীশ কুমারের জেডিইউ ও লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডি জোটের প্রভাব বোঝায় ব্যর্থ হয় সমীক্ষা সংস্থাগুলি।
অনেকেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই বা বিজেপির সামান্য এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মহাগঠবন্ধন ২৪৩টির মধ্যে ১৭৮টি আসন জিতে বিপুল জয় পায়, আর বিজেপি জোট থামে মাত্র ৫৮-তে।
২০১৫ দিল্লি
২০১৪-র ‘মোদী হাওয়ার’ পরে বিশেষজ্ঞরা বিজেপি এবং আম আদমি পার্টির মধ্যে কঠিন লড়াই আশা করেছিলেন।
কিছু সমীক্ষা আপ-কে ৩৫-৪৫টি আসনে এগিয়ে রাখলেও, ৭০টির মধ্যে ৬৭টি আসন জিতে ঐতিহাসিক জয়ের পূর্বাভাস কেউ দিতে পারেনি। বিজেপি পায় মাত্র ৩টি আসন, কংগ্রেস শূন্য।
২০২১ পশ্চিমবঙ্গ
এই নির্বাচনেও অনেক সমীক্ষা ‘হাড্ডাহাড্ডি’ বা বিজেপির জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল, এমনকি ১২০-১৫০ আসন পর্যন্তও বলা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ২১৩টি আসন জিতে বড় জয় পায়। বিজেপি মাত্র ৭৭টি আসন পেয়েছিল।
কেন এমন হয়?
এর একটি বড় কারণ ‘নীরব ভোটার’। বিশেষ করে যেখানে রাজনৈতিক চাপ বা মেরুকরণ বেশি, সেখানে অনেক ভোটার—বিশেষত নারী ও প্রান্তিক মানুষ—তাদের প্রকৃত মতামত প্রকাশ করেন না। ২০১৫ বিহার ও ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে এই বিষয়টিই অন্যতম কারণ ছিল বুথফেরত সমীক্ষার ফল না মেলার। এছাড়াও ভারতের জাত, ধর্ম, সংস্কৃতি, শহর-গ্রামের বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ— তাই সেখানে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ মানুষের নমুনা অনেক সময় বাস্তবতা ধরতে পারে না।
আরও একটি কারণ ভোটের ঠিক আগের ৪৮ ঘণ্টায় স্থানীয় ইস্যুতে বড়সড় ভোটের পরিবর্তন, যা বুথভিত্তিক এক্সিট পোল ধরতে পারে না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ‘ভোট থেকে আসন রূপান্তর”। ভারতে অনেক আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় খুব সামান্য ব্যবধানে—কখনও ১-২ শতাংশ ভোটে। ফলে নমুনায় সামান্য ১-২ শতাংশ ভুলও বড় রাজ্যে ৩০-৫০টি আসনের ভুল পূর্বাভাস তৈরি করতে পারে। ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত নির্বাচনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক্সিট পোলের ফলাফল অনেকটাই “হিট বা মিস” ধরনের।
যেমন, ২০২২ উত্তরপ্রদেশে বেশিরভাগই বিজেপির জয় সঠিকভাবে ধরেছিল, কিন্তু ২০২৩ ছত্তিশগড়ে প্রায় সব সমীক্ষাই কংগ্রেসের জয় বললেও বাস্তবে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
এক্সিট পোল কি বিশ্বাসযোগ্য?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এক্সিট পোলকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে নয়, বরং জনমতের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা উচিত।
একাধিক সমীক্ষার সম্মিলিত প্রবণতা (“পোল অফ পোলস”) একই দিকে গেলে তা তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরযোগ্য হয়। তবে বহু কোণায় বিভক্ত লড়াইয়ে এগুলির নির্ভরযোগ্যতা কমে যায়।