ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের চিকিৎসা করেছিলেন ইজরায়েলি দন্ত চিকিৎসক ডঃ শোটা মোসায়েভ। তাঁর দাবি, হামলার পর ভারতীয় পাইলটের অবস্থা গুরুতর ছিল। মাথা ও হাতে গভীর ক্ষত ছিল এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। মোসায়েভ বলেন, “ওঁর শরীর জুড়ে কাটা-ছেঁড়ার ক্ষত ছিল। মাথা এবং হাত কার্যত ফালাফালা হয়ে গিয়েছিল, প্রায় দু’ভাগ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়েছিল, যদিও সঙ্কট এডজ়ানো গিয়েছে।”
মোসায়েভের দাবি, দুবাই-তেল আভিভগামী ওই বিমানে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন। চিৎকার শুনে তিনি ককপিটের দিকে ছুটে যান। সেই সময় যাত্রীরা হামলাকারীকে আটকানোর চেষ্টা করছিলেন। ককপিটে পৌঁছে তিনি আহত ক্যাপ্টেনের চিকিৎসা শুরু করেন।
তিনি জানান, স্মিত মচ্ছরের রক্তচাপ ক্রমশ কমছিল এবং একসময় তিনি চেতনা হারাতে শুরু করেন। মোসায়েভ বলেন, “তাঁর রক্তচাপ কমে যাচ্ছিল, তিনি ধীরে ধীরে চেতনা হারাচ্ছিলেন।” এই বিবরণে FZ1073 বিমানের ভিতরের ভয়াবহ পরিস্থিতির ছবি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিমানে থাকা ভারতীয় নাগরিক ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে মাঝ-আকাশে তাঁর সহ-পাইলট আক্রমণ করেন। এরপর বিমানটিকে উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করানো হয়।
মোসায়েভ জানান, তাঁর প্রথম লক্ষ্য ছিল রক্তক্ষরণ বন্ধ করা এবং স্মিত মচ্ছরের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করা। ক্যাপ্টেনের মাথা ও হাত-সহ শরীরের একাধিক জায়গায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। এর আগে The Times of Israel-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও মোসায়েভ জানিয়েছিলেন, চিৎকার শুনে তিনি ককপিটে ছুটে যান এবং পাইলটকে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় দেখতে পান। বিশেষ করে মাথা থেকে প্রচুর রক্ত বেরোচ্ছিল।
মোসায়েভ বলেন, “বিমানে আমিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলাম।” তাঁর দাবি, শেষ পর্যন্ত তিনি রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ক্যাপ্টেনের রক্তচাপ স্থিতিশীল করতে সক্ষম হন। তবে হামলাকারীকে কাবু করার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিপুল রক্তক্ষরণের কারণে স্মিতের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল এবং একসময় তিনি জ্ঞানও হারান। পরে স্মিত মচ্ছরকে তাবুকের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। সৌদি আরবে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি চিকিৎসাধীন।
মোসায়েভ যখন আহত পাইলটের চিকিৎসা করছিলেন, তখন বিমানের যাত্রী ও অন্যান্যরা চেষ্টা করছিলেন যাতে হামলাকারী ফের বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারেন। মোসায়েভ বলেন, “আমরাও সন্ত্রাসীকে বেঁধে ফেলেছিলাম।” দন্ত চিকিৎসকের দাবি, আটক করার পর হামলাকারী আর কোনও প্রতিরোধ করেননি। তিনি বলেন, “সে একেবারেই চিৎকার করেনি। চুপচাপ বসে ছিল এবং যা বলা হচ্ছিল, তা মেনে নিয়েছিল।”মোসায়েভ জানান, প্রথমে একজোড়া হেডফোনের তার ব্যবহার করে হামলাকারীর হাত-পা বাঁধার চেষ্টা করা হয়। পরে প্লাস্টিকের জিপ-টাই আনা হলে সেটিও ব্যবহার করে তাকে আটকে রাখা হয়।
যাত্রীদের দেওয়া অন্যান্য বিবরণের সঙ্গেও এই বক্তব্যের মিল রয়েছে। তাঁদের দাবি, বেশ কয়েকজন ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেন। এক যাত্রী The Times of Israel-কে জানান, ককপিটে প্রচুর রক্ত ছিল এবং এক চিকিৎসক আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
বুধবার দুবাই থেকে তেল আভিভের উদ্দেশে উড়েছিল ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমান। মাঝ-আকাশেই ককপিটের ভিতরে আচমকা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিমানটি জরুরি সংকেত পাঠানোর পর আচমকাই দ্রুত নীচে নামতে শুরু করে। মাত্র প্রায় ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতা হারায় বলে জানা গিয়েছে। এরপর যাত্রী ও বিমানকর্মীরা হস্তক্ষেপ করেন এবং বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
পরে বিমানটির গতিপথ বদলে তাবুকের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৪ মিনিটে তারা বিপদসংকেত পায়। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে। ক্যাপ্টেন ও সহ-পাইলট—দু’জনই আহত হন এবং তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ককপিটে হামলার সঠিক কারণ এখনও তদন্তাধীন।
ইজরায়েলি কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং সেটিকে ভেঙে ফেলার সম্ভাব্য প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ধরনের জল্পনা না করার জন্য আবেদন জানিয়েছে ফ্লাইদুবাই।
জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত সহ-পাইলট ওমানের নাগরিক। তাঁর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে তদন্ত চলছে। তবে তাঁর হামলার উদ্দেশ্য এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তাঁর দাবি, গুরুতর আহত অবস্থাতেও স্মিত ককপিটের দরজা খুলে দিতে সক্ষম হন। এর ফলে যাত্রীরা ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করার সুযোগ পান। পাইলট, যাত্রী ও বিমানকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান নেতানিয়াহু।
নেতানিয়াহুর মুখপাত্রের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, মেঝেতে আহত অবস্থায় পড়ে থাকা স্মিত মচ্ছর তাঁর শরীরের “শেষ শক্তিটুকু” ব্যবহার করে ককপিটের দরজা খুলে দেন। বাইরে থাকা যাত্রীরা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক বুঝতে পেরে ককপিটে ঢুকে পড়েন। সেখানে তাঁরা মেঝেতে আহত ক্যাপ্টেনকে পড়ে থাকতে এবং হামলাকারীকে বিমানের নিয়ন্ত্রণের কাছে দেখতে পান।
এরপর যাত্রী হিসেবে বিমানে থাকা ফ্লাইদুবাইয়ের কয়েকজন অফ-ডিউটি পাইলটও পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন। তাঁরা বিমান চালানোর কাজে সহায়তা করেন এবং নিরাপদে বিমানটিকে তাবুকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। বিমানটিতে প্রায় ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। পরে সৌদি আরবে কয়েক ঘণ্টা থাকার পর বিকল্প বিমানে করে তাঁদের সকলকে ইজরায়েলে নিয়ে যাওয়া হয়।