Last Updated:
IIT Kharagpur: শুধু ডিহাইড্রেশন বা সানস্ট্রোক নয়, তীব্র গরমে দেশের বাতাসে ওজোন গ্যাসের মাত্রা হু হু করে বাড়ায় তৈরি হচ্ছে ‘যৌগিক জলবায়ু-বায়ু দূষণ সংকট’। দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে আইআইটি খড়গপুরের গবেষকরা জানিয়েছেন, এই বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে দেশে অকালমৃত্যুর গ্রাফ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যা মোকাবিলায় বর্তমান সরকারি গরম প্রতিরোধক কর্মসূচিতে বড় বদল আনা প্রয়োজন।
খড়গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, রঞ্জন চন্দ: গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ শুধু যে অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা ডিহাইড্রেশনের মাধ্যমে মানুষের শরীরকে ক্লান্ত করছে তা-ই নয়, এর আড়ালে নিঃশব্দে দানা বাঁধছে এক চরম বিপদ। সম্প্রতি আইআইটি খড়গপুরের একটি অগ্রণী গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষকরা জানিয়েছেন, তীব্র তাপপ্রবাহের দিনগুলিতে ভারতের বাতাসে বিষাক্ত ভূ-পৃষ্ঠীয় ওজোন গ্যাসের মাত্রা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতিকে গবেষকরা একটি ‘যৌগিক জলবায়ু-বায়ু দূষণ সংকট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই দুইয়ের মারাত্মক মেলবন্ধন মানুষের ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি করছে, যার ফলে দেশজুড়ে অকালমৃত্যুর এক অদৃশ্য ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
আইআইটি খড়গপুরের কোরাল (CORAL)-এর অধ্যাপক জয়নারায়ণন কুট্টিপুরাস এবং কোচির কুফোস (KUFOS)-এর পি সংগীতার যৌথ পরিচালনায় এই দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাটি চালান হয়েছে। বিখ্যাত আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘এনপিজে ক্লিন এয়ার’-এ এটি প্রকাশিতও হয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ দীর্ঘ দুই দশকের তাপপ্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, গরমের সময় বাতাসে ওজোন গ্যাসের ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৮৫ থেকে ১১০ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছে যায়। এই মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ‘হু’-এর নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেকটাই বেশি। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তই এই বিষাক্ত গ্যাসের শিকার হলেও, উত্তর-পশ্চিম ভারত, সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমি, উত্তর-মধ্য ভারত, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলে এর দাপট সবচেয়ে বেশি। আশঙ্কার কথা হল, পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলে ওজোনের মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে সর্বোচ্চ ১১৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে গিয়েছে।
এই বিষাক্ত ওজোন গ্যাসের প্রভাবে মৃত্যুর পরিসংখ্যানও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই দেশজুড়ে ওজোন গ্যাসের সংস্পর্শে আসার কারণে ২৬,৫০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৮৫০টি মৃত্যু সরাসরি তাপপ্রবাহের সময়ে ওজোনের মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। এই মোট মৃত্যুর মধ্যে ১৫,৬১৫ জন মারা গিয়েছেন ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ বা হৃদরোগে এবং ১০,৮৯৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ বা ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায়। এই পরিসংখ্যান দেশের জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামোর জন্য একটি বড়সড় সতর্কবার্তা।
গবেষকদের মতে, বর্তমানে ভারতে যে সমস্ত ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ বা গরম মোকাবিলা কর্মসূচি চালু রয়েছে, সেগুলির মূল লক্ষ্য থাকে সানস্ট্রোক, হিটস্ট্রেস বা ডিহাইড্রেশন কমান। ফলে, তীব্র গরমের কারণে বাতাস যে ওজোন গ্যাসে বিষাক্ত হয়ে উঠছে, সেই বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে গবেষকরা জরুরি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগামী বছরগুলিতে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব আরও বাড়বে। তাই শুধুমাত্র গরম থেকে রেহাই পাওয়ার সাধারণ উপায়ের মধ্যে আটকে না থেকে, এবার ওজোন পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করা, সময়মতো বায়ুর গুণগত মান নিয়ে স্বাস্থ্য নির্দেশিকা জারি করা এবং জলবায়ু ও দূষণ মোকাবিলায় সমন্বিত কৌশল তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এই লুকিয়ে থাকা ওজোনের বিপদকে এখনই রুখতে না পারলে নাগরিকদের এই অকালমৃত্যু ঠেকান অসম্ভব হয়ে পড়বে।
Paschim Medinipur,West Bengal
