বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে অনুষ্ঠিত ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকের পর যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মোদি বলেন, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে ভারত-জাপানের ‘স্পেশাল স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড গ্লোবাল পার্টনারশিপ’ নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে চলেছে।
তিনি বলেন, “কয়েক দিন আগে জি-৭ সম্মেলনে আমি বলেছিলাম, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে পারস্পরিক বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ। ভারত-জাপান সম্পর্ক সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।” ভারত সফরে আসা জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে স্বাগত জানিয়ে মোদি তাঁকে জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী, একজন ‘দূরদর্শী’ এবং ‘জনপ্রিয়’ নেতা বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, তাকাইচি নারা প্রিফেকচারের বাসিন্দা, যা ভারত ও জাপানের অভিন্ন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দশকে অটোমোবাইল থেকে ইলেকট্রনিক্স—বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপান ভারতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে। তাঁর কথায়, তাকাইচির এই সফর সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
মোদি জানান, ভারত ও জাপান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রথম যৌথ কো-ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে সই করেছে। তাঁর মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে এমন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি হবে, যা আঞ্চলিক শান্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি আরও বলেন, একটি মুক্ত, উন্মুক্ত এবং নিয়মভিত্তিক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যেও ভারত ও জাপান একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জানান, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে সামনে রেখে ভারত ও জাপান একটি যৌথ রোডম্যাপ তৈরি করেছে। এই রোডম্যাপে সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং সাপ্লাই চেন আরও শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মোদি বলেন, “বর্তমান অনিশ্চিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই লক্ষ্যেই আমরা এই যৌথ রোডম্যাপ তৈরি করেছি।”
প্রধানমন্ত্রী ‘ইন্ডিয়া-জাপান বায়োগ্যাস ইনিশিয়েটিভ’-এরও ঘোষণা করেন। এই উদ্যোগের আওতায় ভারতে একাধিক বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে। তাঁর দাবি, এই প্রকল্প টেকসই উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবিকার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতাও আরও সম্প্রসারিত হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে মোদি জানান, গত এক বছরে ভারত ও জাপানের মধ্যে প্রায় ১২০টি নতুন ব্যবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে ভারতে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। তিনি আগামী এক দশকে ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগে হায়দরাবাদ হাউসে প্রতিনিধি-স্তরের বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। ভারতের প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি-সহ একাধিক শীর্ষ আধিকারিক।
দিনের শুরুতে রাষ্ট্রপতি ভবনে সানায়ে তাকাইচিকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অফ অনার দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এই সফর ভবিষ্যৎমুখী ভারত-জাপান অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে, যার ভিত্তি পারস্পরিক বিশ্বাস এবং অভিন্ন মূল্যবোধ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ১ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত তিন দিনের সরকারি সফরে ভারতে রয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এই সফরের অন্যতম আকর্ষণ ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ বৈঠক, যেখানে কৌশলগত, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।