তদন্তে উঠে এসেছে, এটা কোনও আকস্মিক আবেগের বশবর্তী হয়ে ঘটানো অপরাধ নয়। ফরেন্সিক তথ্য এবং নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গিয়েছে, কেতনের জীবনের শেষ ৭২ ঘণ্টা ছিল সুপরিকল্পিত ফাঁদের অংশ, যাতে নিশ্চিত করা হয় যে, সে যেন আর কোনওভাবেই জীবিত অবস্থায় ওই পাহাড়চূড়া থেকে ফিরতে না পারে। তদন্তকারীদের মতে, অভিযুক্তরা ধীরে ধীরে মানসিক প্রভাব খাটানো থেকে শুরু করে শারীরিকভাবে নজরদারি, সবকিছুই পরিকল্পনা করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পারিবারিকভাবে ঠিক হওয়া বিয়ে ভেঙে দেওয়া, কিন্তু একই সঙ্গে ধনী পরিবারের সামাজিক মর্যাদাও অক্ষুণ্ণ রাখা।
পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হয় ১৬ জুন, রবিবার সকালে। অভিযোগ অনুযায়ী, চেতন চৌধুরী নিজের উপস্থিতি গোপন রাখতে একটা অ্যালিবাই তৈরির চেষ্টা করছিল তখন। মোবাইল টাওয়ারের তথ্য বিশ্লেষণে যাতে তাঁর অবস্থান লোনাভলায় ধরা না পড়ে, সে জন্য তিনি নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি পুণের বিবওয়াড়ির নিজের দোকানেই সচল অবস্থায় রেখে যান।
এরপর তিনি গোপনে দোকানের এক কর্মচারীর মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে শুরু করেন। সেই ফোনের মোবাইল ডেটা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা হয়, যাতে জিপিএসের মাধ্যমে অবস্থান নির্ণয় করা কঠিন হয়। অভিযোগ, এই ফোনটি ব্যবহার করেই তিনি সিয়া গোয়ালের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করেন।
১৭ জুন, সোমবারের মধ্যে পুরো ফাঁদ প্রস্তুত হয়ে যায়। সিয়া কেতনকে বোঝান, বিয়ের আগে খুবই মানসিক চাপ চলছে তাঁর৷ তাই চাপ কাটাতে মঙ্গলবার সকালে লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিংয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। কেতন সেই প্রস্তাবে রাজিও হয়ে যান৷ কিন্তু, তিনি তখন জানতেন না, এই সাধারণ, আপাতদৃষ্টিতে রোমান্টিক প্ল্যানই আসলে তাঁর মৃত্যুর ফাঁদ৷ ওঁদের বেরনোর সময়, গাড়ির নম্বরসহ সমস্ত তথ্যই ওই কর্মচারীর ফোনের মাধ্যমে চেতনকে জানানো হচ্ছিল বলে পরে জানতে পেরেছে পুলিশ।
অভিযোগ অনুযায়ী, চেতন আগেই দুর্গের এলাকা ঘুরে দেখেন সেদিন৷ এমন কিছু খাড়া খাদ এবং নির্জন জায়গা চিহ্নিত করেন, যেখানে নিরাপত্তা রেলিং না থাকায় যে কাউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া যায় এবং দিলে সহজেই সেটিকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
১৮ জুন, মঙ্গলবার সকাল ৭টা নাগাদ কেতন ও সিয়া পুণে থেকে রওনা দেন। অভিযোগ, চেতন মোটরবাইকে তাঁদের নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করছিলেন।
লোহাগড় দুর্গের পাদদেশে পৌঁছে চেতন এমন একটি ভুল করেন, যা পরে তাঁর অ্যালিবাই টিকিয়ে রাখতে দেয়নি। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে এই জুন মাসের প্রচণ্ড গরমেও ভারী শীতের হুডি এবং একটি হেডসেট পরে ছিলেন তিনি। এই অস্বাভাবিক পোশাক স্থানীয় বিক্রেতাদের নজরে আসে এবং সিসিটিভি ক্যামেরাতেও তা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
তদন্তকারীদের দাবি, কেতন ও সিয়া যখন দুর্গের একটি নির্জন জায়গায় পৌঁছন, তখন চেতন আড়াল থেকে তাঁদের অনুসরণ করছিলেন। সকালের কুয়াশা থাকায় আশপাশের ট্রেকারদের ভিসিবিলিটিও কমে এসেছিল৷ সেই সুযোগ নিয়ে একটি খাড়া পাহাড়ের ধারে কেতনকে নিয়ে যান সিয়া৷ চেতনও পিছন থেকে ওঁদের ফোলো করেন৷ তারপরে পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক খাদের ধারে বসে পড়ে চেতনকে সিগন্যাল দেন সিয়া৷ সিগন্যাল পেয়ে ধীরে ধীরে কেতনের পিছনে চলে আসেন চেতন৷ তারপরে অতর্কিতে ধাক্কা এবং গভীর খাদে পড়ে মৃত্যু হয় কেতনের।
তবে পরে পুণে রুরাল পুলিশের তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয়দের বয়ান সব ষড়যন্ত্রই ফাঁস করে দেয় সিয়া এবং চেতনের৷