এখন যা ভোট গোনা হয়েছে, তাতে চুয়ান্নটি আসন নেতানইয়াহুপন্থী জাতীয়তাবাদী দক্ষিণপন্থী জোট পাবে। আর আটচল্লিশটি আসন পাবে বিরোধী নেতা গাডি আইসেনকোটপন্থী জোট। তবে এখনও প্রায় পাঁচ লক্ষ ব্যালট গোনা বাকি। আমাদের দেশে যেমন পোস্টাল ব্যালটে সেনা-পুলিশ-সরকারি কর্মীরা ভোট দেন, তেমনই ইজরায়েলেও এগুলিকে অনুপস্থিত ব্যালট বলা হয়। মানে যে ভোটার কাজের জন্যে ভোট দিতে পারেননি, তাঁর মতামতও নেওয়া হয়েছে।
এই ব্যালট একপেশে নেতানইয়াহুর পক্ষে বা বিপক্ষে পড়লে ইজরায়েলে ভোটের হিসেব বদলে যেতে পারে। বা মিলে যেতে পারে। এই ব্যালট প্রায় একশোটি আসনে মীমাংসা করিয়ে দিতে পারে। তা যদি না হয়? তাহলে কী হবে? তার আগে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত যে ইজরায়েলের ভোটের অঙ্কটা কোনও পক্ষেই মিলল না কেন?
কারণ বেঞ্জামিন নেতানইয়াহুর বিধি রাম হয়ে গিয়েছে। আমাদের দেশে বিধি বাম বলে। ইজরায়েলে বিধি রাম। রাম কী? রাম হচ্ছে একটি আরব দল। ইজরায়েল ইহুদিদের প্রমিসড ল্যান্ড। তবে ইজরায়েলে আরবরাও থাকে। ইজরায়েলে আরব কারা? যারা প্যালেস্তাইনীয়। এবং স্বাধীন প্যালেস্তাইনের দাবিতে রাজনীতি করে। তবে ইজরায়েলের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই তারা প্যালেস্তাইনিদের জন্যে দাবিদাওয়া করে।
এমন কয়েকটি দল হচ্ছে, হাদাশ, তাল, বালাদ। এবং এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দল রাম। সবই ইসলামপন্থী। কী আশ্চর্য না! ইসলামপন্থী দলের নাম রাম। তাও আবার ইজরায়েলে। আমাদের দেশের রাজনীতিতে আবার রামের সঙ্গে ইসলামের মেরুকরণটা আলাদা। মানে ইজরায়েলে হিব্রু ভাষায় জয় রাম স্লোগান দেওয়া হতেই পারে।
ইজরায়েলে আরবরা সচরাচর ভোট দেওয়ায় আগ্রহ দেখায় না। ইহুদিদের দেশে তারা সংখ্যালঘু। তাদের সংখ্যা এতটাই কম যে কিছুতেই তারা সরকার গঠন করতে পারবে না। কিন্তু তারা এবার ঢেলে ভোট দিয়েছে। এমন এমন হিসেব করে ভোট দিয়েছে যে উনিশটি আসনে যেখানে যেখানে ভোট পড়ার, সেখানেই পড়েছে। ফলে সরকার গঠনের পথে তারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরব দলগুলি এত আসনে জিতল কী করে? বেঞ্জামিন নেতানইয়াহুর অভিযোগ, ভোট চুরি হয়েছে। আরব দলগুলি অর্থ বিলিয়ে, মাদক বিলিয়ে, ভয় দেখিয়ে এবং নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভোটে কারচুপি করেছে। তুরস্ক এবং কাতার থেকে ইজরায়েলের ভোটে অর্থ বিলি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মানে ইজরায়েলে রেজিম চেঞ্জ করতে বাইরের শক্তি টাকা ঢেলেছে বলে অভিযোগ।
জেরুজালেম পোস্ট সংবাদপত্র রিপোর্ট করেছে। ইজরায়েলের সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটি নাকি সেদেশের গোয়েন্দা বিভাগ শিন বেটকে এই অভিযোগের তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ ইজরায়েলে মুসলিম আরবদের যা জনসংখ্যা, তাতে তারা এত সংখ্যক আসনে জিততে পারে না। ইজরায়েলকে ইসলামিক করার ষড়যন্ত্রেই নাকি এটা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বেঞ্জামিন নেতানইয়াহু।
দেখুন, আমাদের দেশের সঙ্গে কিন্তু মিলে যাচ্ছে। এখানে বিধানসভা নির্বাচনে জনবিন্যাস বদলে দেওয়ার অপচেষ্টার অভিযোগ ছিল। এখানেও রেজিম চেঞ্জে বাইরে থেকে টাকা ঢালার অভিযোগ উঠেছে। সেই একই অভিযোগ ইজরায়েলে তুলছেন বেঞ্জামিন নেতানইয়াহু।
অবশ্য তিনি নিজেও বিপক্ষের কাঠগড়ায়। গাডি আইসেনকোটের সমর্থকদের অভিযোগ, হারবেন জেনে প্রভাব খাটিয়ে বেঞ্জামিন নেতানইয়াহু ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হতে দিচ্ছেন না। কলকাঠি নাড়ার জন্যে সময় কিনছেন।
তবে এই অচলাবস্থা তো চিরকাল স্থায়ী হবে না। ইজরায়েলে যদি জনাদেশ বিভক্তই থাকে, তাহলে কী কী হতে পারে? পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত বেঞ্জামিন নেতানইয়াহুই প্রধানমন্ত্রী থেকে যাবেন। নির্বাচন এড়াতে চাইলে প্রেসিডেন্ট কোনও এক পক্ষের নেতাকে সরকার গড়তে ডাকতে পারেন। তাঁকে বিয়াল্লিশ দিনের মধ্যে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে। আমাদের দেশে যেভাবে আস্থাভোট হয়।
সেক্ষেত্রেও নেতানইয়াহুর ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা। কারণ তাঁর জোট সামান্য এগিয়ে রয়েছে। নেতানইয়াহু বিয়াল্লিশ দিনে সরকার গড়তে না পারলে ডাক পাবেন বিরোধী নেতা গাডি আইসেনকোট।
গাডি আইসেনকোটকে কি বেঞ্জামিন-বিরোধী আরব দলগুলি সমর্থন করবে? করলে তা হবে আত্মহত্যার সামিল। কারণ প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাডি গাজার যুদ্ধে নিজের সন্তান ও আত্মীয়দের মরতে দেখেছেন। তাঁর প্রায় গোটা পরিবার শেষ হয়ে গিয়েছে হামাসের হামলায়। তাই তিনি প্রতিশোধ নিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
নেতানইয়াহু রাজনৈতিক স্বার্থে গাজার যুদ্ধ শেষ করতে সময় নিয়েছেন। এই অভিযোগ তুলেই তিনি ভোটে লড়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বেঞ্জামিন ও গাডি পারস্পরিক জোট করে সরকার তৈরি করতে পারেন। তাও না হলে, নেসেটের কোনও এক নির্বাচিত সদস্যকে প্রেসিডেন্ট আহ্বান জানাতে পারেন। তুমি সংখ্যা জোগাড় কর। আর সরকার গড়। মানে ইজরায়েলের একশো কুড়ি জন নির্বাচিত সাংসদের কাছেই সেই সুযোগ তখন থাকবে।
তবে সংসদে ইতিমধ্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন নেতানইয়াহু। বিরোধীদের সংখ্যা বেশি। আবার এটাও সত্যি যে সরকার গঠন না হলে একসময় আপনা থেকেই সংসদ ভেঙে যাবে। এবং নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যাবে। ফলে বাইরে থেকে সরকার বদলের অপচেষ্টা হয়ে থাকলেও সেটা বোধহয় সম্ভব হচ্ছে না। তবে ইজরায়েলে ইসলামিক রাম একটা নতুন জিনিস।