Last Updated:
চিনে শিশুদের তুলনায় বেড়েছে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা। টানা পাঁচ বছর কমছে জনসংখ্যা। ভারতেও প্রজনন হার কমে ১.৯-এ, ভবিষ্যতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
কয়েক বছর আগেও চিন ও ভারতের মতো দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে উন্নয়নের পথে বড় বাধা বলে মনে করা হত। কিন্তু গত কয়েক দশকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। চিন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া-সহ ইউরোপের একাধিক দেশে জন্মহার কমতে থাকায় জনসংখ্যা নিয়ে নতুন ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। বহু দেশে মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate) কমে এমন স্তরে পৌঁছেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় হারের চেয়ে অনেকটাই কম।
মোট প্রজনন হার বলতে বোঝায়, একজন মহিলা তাঁর সমগ্র প্রজননকালে গড়ে কত সন্তানের জন্ম দেন। সাধারণভাবে, কোনও দেশের জনসংখ্যার বর্তমান স্তর দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখতে এই হার অন্তত ২.১ হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, গড়ে একজন মহিলার ২.১টি সন্তান হওয়া দরকার, যাতে দীর্ঘমেয়াদে জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। প্রজনন হার কমে গেলেই কোনও দেশের জনসংখ্যা সঙ্গে সঙ্গে কমতে শুরু করে না। বরং কয়েক বছর পর তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর অন্যতম উদাহরণ চিন। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে ১৯৮০-র দশকে এক সন্তান নীতি চালু করেছিল চিন সরকার। এর ফলে কয়েক দশক ধরে অধিকাংশ দম্পতির ক্ষেত্রে একটি সন্তান নেওয়ার নীতি কার্যকর ছিল। একই সময়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দ্রুত অগ্রগতি ঘটেছিল চিনে।
বর্তমানে কম জন্মহার এবং প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনে শিশুদের তুলনায় প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। এই পরিবর্তন দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা প্রায় ২২.৩ কোটি। অন্যদিকে, ১৪ বছরের কম বয়সি শিশুর সংখ্যা প্রায় ২১.৩ কোটি। প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আগামী দিনে কর্মক্ষম জনসংখ্যার উপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়লে পেনশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার জন্য সরকারের খরচও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, জন্মহার কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছনো মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে শ্রমবাজার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিও প্রভাবিত হতে পারে।
উপলব্ধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চিনের মোট জনসংখ্যায় প্রবীণ নাগরিকদের অনুপাতও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে একদিকে কম জন্মহার, অন্যদিকে প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন চিনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
গত পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে চিনের জনসংখ্যা। জন্মহার কমে যাওয়া ঠেকাতে ২০১৫ সালে এক সন্তান নীতি তুলে নেয় চিন সরকার। পরে দম্পতিদের দুই এবং তার পর তিনটি সন্তান নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে আর্থিক প্রণোদনা-সহ একাধিক পদক্ষেপও করেছে সরকার। তা সত্ত্বেও জন্মহারে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। চিনের সামনে এখন শুধু জনসংখ্যার আকার বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ নয়, বরং কর্মক্ষম মানুষ এবং প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রজনন হার দীর্ঘদিন কম থাকলে ভবিষ্যতে জনসংখ্যা আরও কমতে পারে। পাশাপাশি, মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রবীণদের অনুপাতও বাড়তে পারে।
ভারতের পরিস্থিতি আপাতত চিনের থেকে আলাদা হলেও এখানেও প্রজনন হার কমেছে। বর্তমানে ভারতে মোট প্রজনন হার কমে প্রায় ১.৯-এ দাঁড়িয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যার বর্তমান স্তর বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২.১ হারের তুলনায় কম। দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যে প্রজনন হার ইতিমধ্যেই রিপ্লেসমেন্ট লেভেল বা প্রতিস্থাপন হারের নীচে নেমে গিয়েছে। আগামী দিনে এর প্রভাব পড়তে পারে জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামোয়। তবে ভারতের বিপুল যুব জনসংখ্যার কারণে চিনের তুলনায় এখানে এই পরিবর্তনের প্রভাব অন্য সময়ে এবং ভিন্নভাবে দেখা দিতে পারে। ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনসংখ্যা, প্রবীণদের দেখভাল, পেনশন এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় ভারতকেও প্রস্তুত থাকতে হবে। কম প্রজনন হার মানেই অবিলম্বে জনসংখ্যা কমে যাওয়া নয়। তবে দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে দেশের জনসংখ্যার কাঠামো এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
