ছেলের এই অভাবনীয় সাফল্যে গর্বিত বাবা দেবাশীষবাবু জানাচ্ছেন ব্যবসা বড় হলেও পড়াশোনা জানা সত্ত্বেও হিসাব এবং কাগজপত্র সম্পর্কে যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় থাকতেন। তবে প্রথম দিকে পরিশ্রম এবং নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগালেও পরবর্তীতে পড়াশোনারত ছেলের, সহযোগিতায় সফলতা এসেছে।
তাই আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী দিনে এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে তাঁর ছেলে। তবে কোনও বহুজাতিক সংস্থায় (কর্পোরেট) মোটা মাইনের চাকরি নয়, নিজের স্বাধীন ফার্ম তৈরি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে চান শান্তিপুরের নতুন সিএ সৌম্যদীপ। তাঁর এই সাফল্যে বর্তমানে খুশির হাওয়া গোটা শান্তিপুরে।
মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করার পর বাণিজ্য বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করা বহু পড়ুয়ার চোখেই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার স্বপ্ন থাকে। তবে এই সাফল্যের শিখরে পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ যোগ্যতা এবং কঠিন প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। সৌম্যদীপকেও এই লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য ‘ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ ইন্ডিয়া’ পরিচালিত দীর্ঘ ও জটিল কোর্সের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সিএ কোর্সের তিনটি প্রধান স্তর— ফাউন্ডেশন, ইন্টারমিডিয়েট এবং ফাইনাল। প্রতিটি ধাপেই কঠোর লড়াইয়ের পর সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
সাফল্যের এই প্রস্তুতি অত্যন্ত কঠিন হলেও তা যে অসম্ভব নয়, তা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রমাণ করেছেন শান্তিপুরের এই কৃতি সন্তান। নিজের লড়াইয়ের দিনগুলির কথা মনে করিয়ে দিয়ে সৌম্যদীপ জানান, সিএ পড়ার ক্ষেত্রে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি হল ‘সিএ ফাউন্ডেশন’। এর জন্য প্রথমেই ‘ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ ইন্ডিয়া’-তে নিজের নাম নথিভুক্ত করতে হয়। সেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল হলে তবেই মেলে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হওয়ার ছাড়পত্র। এরপর সিএ ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার দু’টি বিভাগে মোট ছ’টি পত্রের পরীক্ষা দিতে হয়। পরবর্তী চূড়ান্ত স্তরে যাওয়ার জন্য পরীক্ষার্থীকে অবশ্যই উভয় গ্রুপে সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে হয়।
ইন্টারমিডিয়েট পর্ব কাটার পর শুরু হয় ‘আর্টিকেলশিপ’-এর জন্য নাম নথিভুক্তকরণের প্রক্রিয়া, যা সিএ পাঠ্যক্রমের অন্যতম মূল ভিত্তি। এই পর্বে দু’বছরের জন্য আর্টিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে একজন পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের অধীনে সরাসরি কাজ শেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। এই আর্টিকেলশিপ চলাকালীনই প্রার্থীকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির চূড়ান্ত (ফাইনাল) পরীক্ষার জন্য আবেদন করতে হয় এবং সেই কঠিন পরীক্ষায় পাশ করলেই আসে চূড়ান্ত সাফল্য। ফাইনাল পরীক্ষা পাশের পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ‘ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ ইন্ডিয়া’-এর স্থায়ী সদস্য পদ পান এবং একজন স্বীকৃত সিএ হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করার আইনি অধিকার লাভ করেন।
বর্তমানে ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা, ট্যাক্সেশন, আর্থিক পরিকল্পনা, ফরেনসিক অডিটিং, অ্যাকাউন্টিং এবং এক্সটার্নাল রিপোর্টিং, অডিটিং, ব্যাঙ্কিং কিংবা বিমা সংক্রান্ত ক্ষেত্রে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের জন্য বিপুল অঙ্কের মাইনের চাকরির সুযোগ ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু সেই চেনা বৃত্তে পা না বাড়িয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস করতে চান শান্তিপুরের সৌম্যদীপ। এ প্রসঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে একটা অহেতুক ভয় কাজ করে। আমি সেই ভয় কাটিয়ে তাঁদের মনে ভরসা জোগাতে চাই। ছোট থেকে বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীদের সঠিক ট্যাক্সেশন ব্যবস্থার হদিশ দিয়ে, সম্পূর্ণ আইনি পথে তাঁদের ব্যবসার রাস্তা মসৃণ করে তোলাই আমার মূল লক্ষ্য। এছাড়াও, এলাকার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি এই সম্মানজনক পেশায় আসতে চায়, তবে তাদেরকে সব রকমভাবে সাহায্য করা এবং এই পেশা সম্পর্কে সচেতন করা আমার অন্যতম ইচ্ছে।”
শুধু নিজের সাফল্যটুকুই শেষ কথা নয়, সৌম্যদীপের স্বপ্ন— আগামী দিনে দেশজুড়ে আরও চার লক্ষেরও বেশি যোগ্য ছেলেমেয়ে এই পেশায় এগিয়ে আসুক, এবং দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রে কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত খুলে যাক। তবে সৌম্যদীপ শুধু হিসাবে পারদর্শী তাই নয় দাদুর সাংস্কৃতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার হাতে খড়ি গান- কবিতা লেখা এবং বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো তেও সে পারদর্শী। জানায় মানসিক ভাবে সুস্থতা থাকলে তবেই মনসংযোগ করা সম্ভব হয় পড়াশোনায়।