পুণে গ্রামীণ পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, কেতনের শেষকৃত্যের চার দিন পরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সামনে আসে, যখন তাঁর বাগদত্তা সিয়া গোয়াল কেতনের পরিবারের বাড়িতে যান। সেই সময় কেতনের বোন তাঁকে দুর্ঘটনার আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করেন। পুলিশের সূত্রের দাবি, সিয়ার উত্তরগুলিতে অসঙ্গতি ও সন্দেহজনক দিক ধরা পড়ে, যা পরিবারকে তদন্তকারীদের সতর্ক করতে প্ররোচিত করে।
পরবর্তীকালে সেই সন্দেহই এমন একটি সূত্রে পরিণত হয়, যা পুলিশ বর্তমানে সিয়া গোয়াল এবং তাঁর প্রেমিক চেতন চৌধুরীকে নিয়ে একটি অত্যন্ত প্ল্যানড হত্যার ষড়যন্ত্র বলে বর্ণনা করছে, তার রহস্য উন্মোচনে সাহায্য করে।
তদন্তে পরে জানা যায়, সিয়া এবং চেতন গত তিন বছর ধরে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। পুলিশি তদন্তে দেখা গিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে তাঁদের মধ্যে মোট ২,০০৪ বার কথা হয়েছে এবং ফোনালাপের মোট সময় ছিল ২৩৮ ঘণ্টা !
পুলিশের অভিযোগ, ফোন কল ছাড়াও সিয়া ও চেতন নিয়মিতভাবে ফেসটাইম এবং হোয়াটসঅ্যাপ কলের মাধ্যমেও যোগাযোগ রাখতেন।
একাধিক ব্যর্থ চেষ্টার পর ‘নিখুঁত সুযোগ’:
পুলিশের দাবি, ১৮ জুন কেতন আগরওয়ালকে হত্যা করার ঘটনাটি তাঁর প্রাণনাশের প্রথম চেষ্টা ছিল না। তদন্তকারীরা অন্তত তিনটি পূর্ববর্তী ব্যর্থ হত্যাচেষ্টার খোঁজ পেয়েছেন, যা সিয়া গোয়াল ও চেতন চৌধুরী নাকি লোহাগড় দুর্গের ঘটনাটির আগে করেছিলেন।
একটি ঘটনায়, অভিযোগ অনুযায়ী, সিয়া একটি সাপের হাত থেকে কেতনকে বাঁচানোর ভান করে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। অন্য কয়েকটি ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গিয়েছে।
পুলিশের মতে, এই যুগল দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ‘নিখুঁত সুযোগ’-এর অপেক্ষায় ছিল, যখন পরিকল্পনাটি সফলভাবে কার্যকর করা যাবে।
সেই সুযোগ আসে ১৮ জুন, যখন সিয়া তাঁর জন্মদিন উদযাপনের অজুহাতে কেতনকে লোহাগড় দুর্গে যাওয়ার জন্য রাজি করান।
সূত্রের পর সূত্র:
তদন্তকারীদের দাবি, ধরা পড়া এড়াতে চেতন অত্যন্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। পুলিশ জানতে পেরেছে, ওই দিন সকাল প্রায় ৭টা থেকে বিকেল ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত তাঁর ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ ছিল। তদন্তকারীদের অভিযোগ, নিজের অবস্থান শনাক্ত হওয়া এড়াতে চেতন তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি দোকানে রেখে গিয়েছিলেন এবং পরিবর্তে এক কর্মচারীর ফোন সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করেছিলেন।
তবে শেষ পর্যন্ত একটি হুডিই তদন্তের অন্যতম বড় সূত্র হয়ে ওঠে ৷ সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, জুন মাসের তীব্র গরমের মধ্যেও হুডি পরা এক ব্যক্তি কেতন ও সিয়ার গাড়িকে অনুসরণ করছে এবং লোহাগড় দুর্গের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। অস্বাভাবিক এই পোশাকই তদন্তকারীদের নজর কেড়ে নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তাঁর সন্ধান পেতে সাহায্য করে। পরে পুলিশ তাঁকে চেতন চৌধুরী হিসেবে চিহ্নিত করে।
এছাড়াও, ঘটনার দিন সম্পর্কে সিয়ার বর্ণনায় একাধিক অসঙ্গতি খুঁজে পায় পুলিশ। বিশেষ করে কেতন খাদে পড়ে যাওয়ার পর তিনি যে ব্যাখ্যাগুলি দিয়েছিলেন, সেগুলিও তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে। এর ফলেই পুলিশ আরও গভীর তদন্ত শুরু করে।
যে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন কেতন:
তদন্তকারীদের কাছে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, কেতন সম্প্রতি সিয়া গোয়ালের অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন। পাশাপাশি, সিয়ার অতীত ও ব্যক্তিগত পটভূমির কিছু বিষয় নিয়েও তাঁর মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।
আত্মীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সন্দেহগুলি তখনও বড় ধরনের কোনও বিরোধ বা মুখোমুখি সংঘর্ষের রূপ নেয়নি। তবে মৃত্যুর আগের কয়েক মাস ধরে বিষয়গুলি কেতনকে ক্রমশ চিন্তিত করে তুলছিল।
এদিকে তদন্তকারীরা আরও একটি অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন যে, প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের জন্য নির্ধারিত বালি সফরটি সিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ভণ্ডুল করে দিয়েছিলেন। অভিযোগ, তিনি কেতনের পাসপোর্ট সরিয়ে রেখেছিলেন, যার ফলে সফরটি বাতিল হয়ে যায়। পুলিশের মতে, এই ঘটনাটি তাঁদের সম্পর্কের ধরন এবং অভিযুক্তদের পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
এই মামলাটি দুই পরিবারকেই আরও বেশি স্তম্ভিত করেছে, কারণ বিয়ের সমস্ত প্রস্তুতি তখন জোরকদমে চলছিল। অনুষ্ঠানস্থল বুকিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন উদ্যাপনের পরিকল্পনাও করা হচ্ছিল। কিন্তু সেই সম্পর্কের পরিণতি শেষ পর্যন্ত এমন এক ঘটনায় গিয়ে পৌঁছায়, যাকে পুলিশ এখন একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করছে।