পেশাগত কারণে বাদল সরকার নিজেও তাঁর জীবনের একটি সময় প্যারিসে কাটিয়েছিলেন। তাই তাঁর সৃষ্টিকে আবার এই শহরে ফিরিয়ে আনা গেল। এর আগে স্বল্প পরিসরে একটি প্রদর্শনীতে কান চলচ্চিত্র উৎসবেও আদৃত হয়েছিল ছবিটি।

বাদল সরকারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে নির্মিত পাগলা ঘোড়া তাঁর বহুলচর্চিত নাটককে একটি স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রভাষায় উপস্থাপন করেছে। মঞ্চের জন্য লেখা এই আখ্যানকে কেবল প্রোসেনিয়াম থিয়েটারের পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা, আবহ, দৃশ্যমানতা এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিসরের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে অন্বেষণ করেছেন শেখর দাশ।

ছবির কাহিনি:

পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত অরণ্যাঞ্চলের শ্মশানে এক রাত। আত্মহত্যা করা এক তরুণীর শেষকৃত্যের জন্য সেখানে অপেক্ষা করছেন ভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত পরিচয়ের চার পুরুষ। চিতায় যখন তরুণীর দেহ দাহ হচ্ছে, তাঁরা তাস খেলেন, মদ্যপান করেন এবং নিজেদের জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে কথাবার্তা বলতে থাকেন। রাত যত গভীর হয়, তাঁদের কথোপকথনের মধ্যেই ধীরে ধীরে প্রবেশ করে সেই নামহীন মৃত তরুণীর অদৃশ্য উপস্থিতি। তাঁরা তাঁকে দেখতে বা শুনতে পান না, কিন্তু তাঁর স্মৃতি, তাঁর জীবন এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে তাঁদের নিজেদের জীবনের সম্পর্ক একে একে উন্মোচিত হতে থাকে। চার পুরুষের কথাবার্তার আড়ালে প্রকাশ পায় তাঁদের আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ, সামাজিক অবস্থান, সম্পর্কের সংকট এবং নারীর প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি। নামহীন তরুণীর জীবনের করুণ পরিণতি যেন তাঁদের প্রত্যেকের জীবনের কোনও না কোনও অন্ধকার সত্যকে প্রতিফলিত করে। ক্রমশ বাস্তব ও অতিলৌকিকের সীমানা মুছে যেতে থাকে। শ্মশানের সেই রাত হয়ে ওঠে মানুষের সম্পর্ক, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, সামাজিক ভণ্ডামি, প্রেম, কামনা, অপরাধবোধ এবং এক নারীর অপূর্ণ জীবনের এক গভীর অনুসন্ধান।

পরিচালক শেখর দাশ জানান, “বাদলদার পাগলা ঘোড়া ছোটবেলা থেকে দেখে ও পড়ে বড় হয়েছি। বিদেশে থাকাকালীন বাদলদা অনেক নাটক লিখেছিলেন সিনেমার স্মৃতি থেকে। সেই স্মৃতি থেকেই এবার পাগলা ঘোড়াকে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এই ছবিটি কোনও নাটকের নিছক চলচ্চিত্রায়ণ নয়। এটি বাদল সরকারের চেতনা, তাঁর যন্ত্রণা এবং তাঁর অসামান্য সৃষ্টিশীলতার এক বিশ্বস্ত অথচ নির্ভীক পুনর্ব্যাখ্যা। নাটকে পুরুষতান্ত্রিকতার যে নেতিবাচক দিকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, পর্দাতেও সেটিই অবিকৃতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।”

পরিচালকের মতে, নাটকের মূল বক্তব্য অক্ষুণ্ণ রেখেই ছবিটির ক্যানভাসকে চলচ্চিত্রের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।

স্বভূমি এন্টারটেইনমেন্টের প্রযোজক ড. প্রবীর ভৌমিক এবং নির্বাহী প্রযোজক বিপাশা ঘোষালের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাদল সরকারের থিয়েটার তাঁদের কাছে শুধু অভিনয় বা বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; তার মধ্যে ছিল দর্শন, কবিতা এবং প্রতিবাদের সম্মিলন। পাগলা ঘোড়া সেই উত্তরাধিকারের প্রতি তাঁদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং একই সঙ্গে সমাজের এক চিরন্তন আয়না।

অভিনেত্রী গার্গী রায়চৌধুরী জানিয়েছেন, “পাগলা ঘোড়া পাগল প্রেমিক পুরুষের প্রতীক। একটা পাগল করা প্রেম!প্রত্যেক নারীই এই পুরুষকে কামনা করে। যাকে পোড়ানো হচ্ছে সে যেন নারীজাতির প্রতীক। চার জন পুরুষের সঙ্গে ওই মেয়েটি জড়িয়ে পড়েছিল। এ বার সে যেন ওই পুরুষের হৃদয় খুঁড়ে বেদনা নিংড়ে বার করছে। আর প্রশ্ন তুলেছে—‘বলো না বলো! জ্বলছে? না জুড়োচ্ছে!’” গার্গীর মতে, এই দার্শনিক ভাবনাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে অভিনেতা রজতাভ দত্তের কথা অনুযায়ী, “আমার চারপাশের অনেক পুরুষকে দেখেছি, যাঁরা পুরুষতান্ত্রিকতার মিথ ভাঙার দলে শামিল। আবার এও দেখেছি, অনেক নারীর অন্তরে পুরুষতন্ত্রের বাস। তাই পুরুষ হওয়ায় লজ্জিত নই। পুরুষতান্ত্রিকতার কুফল কমাতে পারিনি বলে তার জন্য লজ্জিত।”

নাটক থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তর প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, নাটক থেকে ভালো ছবি তৈরি হওয়ার বহু উদাহরণ রয়েছে। তবে সিনেমায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য ও সংলাপে পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। তাঁর মতে, পাগলা ঘোড়া-কে পর্দায় নিয়ে আসার সময় শেখর দাশ নাটকটির মূল সত্তায় খুব বেশি পরিবর্তন আনেননি।

ছবিতে অভিনয় করেছেন, গার্গী রায়চৌধুরী, রজতাভ দত্ত, সুজন মুখোপাধ্যায়, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, চান্দ্রেয়ী ঘোষ, জয়ন্ত হোড়, সৃজিতা সাহা, দীর্ঘয়ী পাল প্রমুখ ৷

আন্তর্জাতিক যাত্রার নতুন অধ্যায়:

পাগলা ঘোড়া-র প্যারিসে এই উদ্বোধনী প্রদর্শনী তাই শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের ঘটনা নয়। এটি বাদল সরকারের নাট্যচিন্তা, তাঁর সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার এবং বাংলা সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরার একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।

বাদল সরকারের জন্মশতবর্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শুরু হওয়া পাগলা ঘোড়া-র যাত্রা এবার পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসরে। মঞ্চের সীমানা অতিক্রম করে চলচ্চিত্রের ভাষায় নির্মিত এই আখ্যান প্যারিসে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দেবে বাদল সরকারের সেই চিরকালীন প্রশ্নগুলিকে—মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক কাঠামো, নারী-পুরুষের ক্ষমতার সমীকরণ, আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ এবং জীবনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য অনুচ্চারিত সত্য।

ল্য গ্যাঞ্জ সুর সিয়েন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে পাগলা ঘোড়া-র এই প্রদর্শনী তাই শুধু ছবিটির আন্তর্জাতিক যাত্রার একটি নতুন অধ্যায় নয়; এটি বাংলা নাট্য ও চলচ্চিত্রের সৃজনশীল উত্তরাধিকারকে বিশ্বদর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

By Admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WordPress Catalog Fashi WP – Multipurpose Fashion WooCommerce WordPress Theme Fashion Feast – WooCommerce Responsive Theme Fashion Feel – WooCommerce Elementor Template Kit Fashion Instincts – WooCommerce Elementor Template Kit Fashion Spirit – WooCommerce Elementor Template Kit Fashion Store – Hanbags, Shoer RTL Responsive WooCommerce WordPress Theme Fashionable – Fashion Shop Elementor Template Kit Fashionly – Fashion Blog Theme Fashiro WP – Multipurpose Elementor WooCommerce Theme Fashly – Fashion & Clothing Designer Elementor Template Kit