Last Updated:
খান স্যার এখন ফয়জল খান নামে পরিচিত হচ্ছেন। যাঁকে নিয়ে লাখ লাখ মানুষ এতদিন মুগ্ধ ছিলেন ৷ আজ পুলিশের পাঁচটি টিম তাঁকে খুঁজছে। যাঁর কাছে পড়ার ইচ্ছা হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীদের ছিল, সেই বশীর খানের ছেলে আজ হিরো থেকে ভিলেন হয়ে গিয়েছেন ৷
পটনা: সবাই তাঁকে ‘খান স্যার’ নামে চেনে। তাঁর পড়ানোর ‘দেশি স্টাইল’-এর জন্য পুরো দেশে তিনি ছড়িয়ে পড়েছিলেন। একটা বন্ধ ঘর থেকে শুরু হওয়ার পর, ইউটিউব সেটাকে একটা ‘রেভোলিউশন’ বানিয়ে দিয়েছিল। জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, এক ঝলক দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমে যেত। যখন অনলাইন ক্লাস শুরু হত, তখন রিয়েল টাইমে লাখ লাখ মানুষ ফলো করতেন। সব মঞ্চ থেকে একটাই স্বপ্ন দেখাতেন – ‘‘যদি কোনও গরীব আমার দরজায় আসেন, তাহলে শুধু দারিদ্রের কারণে তাঁর স্বপ্নকে মরতে দেব না’’। হোমগার্ড-পুলিশ ভর্তি থেকে ইউপিএসসি সবের মধ্যেই ছিলেন খান স্যার। আসলে সফলতার শর্টকাট সবাই জানতে চায়। তাই যখনই কোনও সফল ছাত্রছাত্রী খান স্যারের নাম নেন, লাখ লাখ যুবক তাঁর ফ্যান হয়ে যায়। সেই খান স্যারকে আজ ‘ফয়জল খান’ বলা হচ্ছে। নাম পুরো লিখতে বা বলতে কোনও সমস্যা নেই, কিন্তু ‘স্যার’ শব্দটা বাদ দিয়ে নামের প্রথম শব্দটা যোগ হয়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছে যেন সবকিছু বদলে গিয়েছে। ফয়জল খান এখন পলাতক। তাঁকে খুঁজতে পাঁচজন অফিসারের টিম তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে দু’জন ডিএসপি আর তিনজন এসএইচও আছেন। খান স্যার থেকে ফয়জাল খান হওয়ার যাত্রা ‘হিরো’ থেকে ‘ভিলেন’ পর্যন্ত হওয়ার গল্প বলে।
সম্প্রতি পটনা পুলিশ হানা দিয়েছেিল ফয়জল খান ওরফে খান স্যারের কোচিং ইনস্টিটিউট ‘খান গ্লোবাল স্টাডিজ’ (কেজিএস)-এ। কদমকুয়া থানায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার চেষ্টা এবং অস্ত্র আইনের ধারায় এফআইআর দায়ের হওয়ার পরে তদন্ত আরও জোরদার করা হয়েছে। খান স্যারের কোচিং ইনস্টিটিউটে গুলি চলার ঘটনায় জড়িত বলে অভিযুক্ত নিরাপত্তা কর্মীদের গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ এফআইআর দায়ের করে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে পটনা পুলিশ তিনটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। এই দলগুলি সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ করছে।
ঘটনাটা ২ জুন ২০২৬ সালের রাতের। পটনার খান গ্লোবাল অ্যাকাডেমির বাইরে হওয়া হাঙ্গামার সময় খান স্যার তাঁর সিকিউরিটি গার্ডদের ভিড়কে ভয় দেখাতে আর তাড়িয়ে দিতে ফায়ারিং করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ। এফআইআর অনুযায়ী, এই ঘটনায় তাঁর গার্ডরা রাইফেল থেকে অনেক রাউন্ড গুলি চালায়, যার ফলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের মতে, এই ফায়ারিং অবৈধভাবে করা হয়েছিল এবং এতে মানুষের মধ্যে ভয় আর হুড়োহুড়ির পরিবেশ তৈরি হয়। পাশাপাশি, তাঁর ইনস্টিটিউট আর স্টাফের মাধ্যমে হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া বাড়ানোর এবং আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগও আনা হয়েছে। কিন্তু যখন কেউ ভিলেন হয়ে যায়, তখন তাঁর ‘কুন্ডলির’ সব সাপযোগ সক্রিয় হয়ে যায়। এখন এফআইআর ছাড়াও আরও কিছু ঘটনা সামনে আসছে। একটা ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে, যেখানে ফয়জল খানকে এক ছাত্রকে গালি দিতে শোনা যাচ্ছে। তাকে গালি দিতে দিতে ফয়জল খান বলেন, ‘‘তুমি তো গায়ক, পরিবার থেকে দু’জন মহিলাকে নাচিয়ে দাও, যেকোনও চাকরির থেকে বেশি টাকা পাবে।’’

আদালতে যখন ফয়জল খানকে পেশ করা হবে, তখন আরও কত গোপন তথ্য বেরিয়ে আসে, সেটাই দেখার। আপাতত ফয়জলের চেষ্টা আগাম জামিন পাওয়ার, যাতে জেলে যাওয়া থেকে বাঁচা যায় আর তাঁর কোচিং সাম্রাজ্যও বাঁচে। কলঙ্ক তো লেগেই গিয়েছে। যদিও তাঁর উকিল সরাসরি ফাঁসানোর অভিযোগ তুলেছেন।
খান স্যারের উত্থান:
উত্তরপ্রদেশের দেবরিয়াতে একটা ছোট্ট জায়গা আছে, নাম ভাটপার রানি। এখানেই খান স্যারের জন্ম আর ছোটবেলা কেটেছে। উনি পরমা মিশন স্কুলে পড়তেন। পরে তাঁর বাবা বশীর খান পরিবার নিয়ে পটনাতে চলে আসেন। ফয়জল খানের স্বপ্ন ছিল আর্মিতে যোগ দেওয়ার। তাঁর দাদা নিজেই কমান্ডো। খান স্যার তাঁর ভিডিওতে দাবি করেছেন, উনিও NDA পাশ করেছিলেন, কিন্তু শারীরিক পরীক্ষায় হাতের একটা মেডিক্যাল সমস্যার জন্য বাদ পড়ে যান। খান স্যারের কথায়, ছাত্রজীবনেই পরিবারকে সাহায্য করার জন্য উনি ওয়েল্ডিংয়ে কাজ করেছেন আর JCB-ও চালিয়েছেন তিনি। পরে এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি থেকে খান স্যার ভূগোলে এমএ ডিগ্রি নেন।
২০১০-এ ফয়জল খান মুসল্লাহপুর, পটনাতে কোচিং সেন্টার খোলেন। তখন উনি নিজেই দেওয়ালে প্রচারের পোস্টার লাগাতেন। পরে ক্লাসে ২ হাজার ছাত্র আসতে শুরু করলে অনেকগুলো টিভি স্ক্রিন লাগান। ২০১৯-এ তিনি ইউটিউবে আসেন আর করোনা লকডাউনে ইন্টারনেটে খুব জনপ্রিয় হয়ে যান। কাজ এতটাই বেড়ে যায় যে ২০২১-এ খান গ্লোবাল স্টাডিজ নামে অ্যাপ লঞ্চ করেন আর এটাকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে বদলে দেন।
তদন্তে কী উঠে এসেছে?
তদন্তের সময়ে পুলিশ বেশ কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, নিরাপত্তারক্ষীদের মধ্যে কয়েকজন স্বীকার করেছেন যে সংঘর্ষের সময়ে তাঁদের পক্ষ থেকেও গুলি চালানো হয়েছিল। সেই জবানবন্দির ভিত্তিতেই পুলিশ খান স্যারের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে শুরু করে। এর পরে ৫ জুন পাটনার কদমকুয়াঁ থানায় খান স্যারের বিরুদ্ধে FIR দায়ের হয়।
Kolkata,West Bengal
Jun 09, 2026 10:12 AM IST
