মহারাষ্ট্রের লোহাগড় দুর্গের খাড়া পাহাড় আর প্রাচীন পাথুরে দেওয়াল সাক্ষী রইল এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার। সেখানে প্রেমের নামে ছড়ানো হয়েছিল এক মরণফাঁদ। আর কয়েকমাস পরেই রাজকীয় বিয়ে হওয়ার কথা ছিল পুণের কেতন আগরওয়াল ও সিয়া গয়ালের। রাজস্থানের এক প্যালেসে বিয়ের জন্য প্রায় ১৭ কোটি টাকা খরচও হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগে লোহাগড় ফোর্টের এই সফর হয়ে উঠল কেতনের মৃত্যুযাত্রা। বিশ্বাস, ভালবাসা নাকি এক পরিকল্পিত মৃত্যুর ফাঁদ? আর কয়েকমাস পরেই যাদের রাজকীয় বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল, তা এক নিমেষে পরিণত হল শ্মশানের নিস্তব্ধতায়। অনেকেই কেতন আগরওয়াল খুনের সঙ্গে মিল পাচ্ছেন মেঘালয়ে রাজা রঘুবংশী হত্যাকাণ্ডের। ওখানে মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে স্বামীকে পাহাড় থেকে ফেলে খুনের অভিযোগ ওঠে স্ত্রী সোনম রঘুবংশীর বিরুদ্ধে। এবার কেতন আগরওয়ালের খুনের ঘটনাকে ঘিরে গোটা দেশে চলছে চর্চা।
গত ১৮ জুন পুণের বিখ্যাত লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিং করতে গিয়ে ৪০০ ফুট গভীর খাদে পড়ে মৃত্যু হয় ২৬ বছর বয়সী সফল ব্যবসায়ী কেতন বিশাল আগরওয়ালের। প্রথমে সাধারণ দুর্ঘটনা মনে হলেও, পুলিশের ম্যারাথন জেরায় উঠে এসেছে হাড়হিম করা সত্য। পরিবারকে বিয়ে বাতিলের কথা বলার চেয়ে হবু স্বামীকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়াই সহজ মনে হয়েছিল ১৯ বছর বয়সী বাগদত্তা সিয়া গয়ালের। আর এই ঘৃণ্য অপরাধে তাঁর সঙ্গী ছিলেন প্রেমিক চেতন চৌধরী।
ছক কষে খুন:
নিজের হবু বউ সিয়া গয়ালকে বিশ্বাস করে লোহাগড় ফোর্টে তাঁর জন্মদিন সেলিব্রেশনের জন্য গিয়েছিল পুনের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে কেতন আগরওয়াল। তখনই হুডি পরে তাঁদের পিছু নেন সিয়ার প্রেমিক চেতন চৌধরি। এরপর এক নির্জন জায়গায় ফোর্ট থেকে কেতন আগরওয়ালকে ঠেলে ফেলে দেন চেতন। অভিযোগ, এমনই। ৪০০ ফুট উচুঁ ফোর্ট থেকে পড়ে মৃত্যু হয় ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালের। এমনকি, দুর্ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগঘন পোস্ট করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার অভিনয়ও চালিয়ে যান সিয়া। এটাই প্রথম নয়, আগেও কেতনকে খুনের ছক কষেন সিয়া ও চেতন।
বারবার খুনের চেষ্টা:
গত ১৪ জুন লোহাগড় ফোর্টে যান কেতন ও সিয়া। সেদিনও কেতনকে ধাক্কা মারেন সিয়া। কিন্তু বরাতজোরে একটা গাছ আঁকড়ে ধরায় সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান কেতন। এর আগে ৫ জুন লোহগড় দুর্গে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও কেতনের মায়ের বাধায় তা ভেস্তে যায়। পরপর দু’বার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় সিয়াকে ধমক দিয়ে চেতন বলেছিলেন, ‘‘তোমার দ্বারা এ কাজ হবে না, কাজটা আমাকেই করতে হবে ৷’’
শেষ পর্যন্ত নিজের জন্মদিনের আগের দিন, ১৮ জুন চেতনকে সঙ্গে নিয়ে লোহাগড় ফোর্টে যান সিয়া। সেখানেই কেতনকে ধাক্কা দিয়ে গভীর খাদে ফেলে দেন সিয়ার প্রেমিক চেতন বলে অভিযোগ।
তদন্তে নেমে চোখ কপালে পুলিশের:
খুনটিকে প্রথমে একটা সাধারণ ‘দুর্ঘটনা’ বলে চালানোর সব রকম চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। পুলিশ জানতে পারে, ভালবাসার অভিনয়কে হাতিয়ার করেই বোনা হয়েছিল ঘৃণ্য অপরাধের ছক।
পুলিশের নজরে আসে লোহাগড় দুর্গের সিসিটিভি ফুটেজ। তীব্র গরমের মাঝেও মুখ ঢাকা হুডি পরে এক যুবককে দেখা যায় সিসিটিভি ফুটেজে। এরপরই মোবাইল টাওয়ার লোকেশন, কল রেকর্ড দেখে পুলিশের খটকা আরও জোরদার হয়। গ্রেফতার করা হয় সিয়া গয়াল ও তার প্রেমিক চেতন চৌধরিকে। আর জেরা শুরু হতেই বেরিয়ে আসে ঠান্ডা মাথায় করা খুনের রোমহর্ষক সত্য।
LOVE, ধোঁকা, খুন…
পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছে, ক্রিকেটের মাঠে সিয়া ও চেতনের পরিচয় হয়। তারপর থেকে সিয়া ও চেতনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এমনকি, খুনের ঠিক আগের দিন, ১৭ জুন পুণের লুল্লানগরের একটি ক্যাফেতেও এক ঘণ্টা একসঙ্গে সময় কাটান সিয়া ও তার প্রেমিক চেতন। তার পরদিনই পরিকল্পনা মাফিক খুন করা হয় কেতনকে।
ঠান্ডা মাথায় খুন:
কেতনের মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি পরিবার। সন্দেহ থেকেই গত ২৩ জুন থানায় FIR দায়ের করে পরিবার। মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া এফআইআরে তাঁর বাগ্দত্তা সিয়া গোয়লের ‘অস্বাভাবিক আচরণের’ কথা উল্লেখ রয়েছে।
কেতন আগরওয়ালের বাবা বিশাল আগরওয়াল বলেন, ‘‘ফেব্রুয়ারিতে এনগেজমেন্টের পর থেকেই কিছ না কিছু চলছিল। ৫ জুন লোহাগড় যাওয়ার জন্য জোর করে সিয়া। ১৮ তারিখ ফের লোহাগড় যাওয়ার কথা বলে সিয়া। বন্ধুদের প্ল্যান থাকার কথা বলে জোর করে সিয়া। কেতনের মা-কেও ফোন করে কেতনকে যেতে চাপ দেয় সিয়া ৷’’
এফআইআরের বয়ান অনুযায়ী, ৪ জুন সিয়া এবং কেতনের লোহাগড় ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা বাতিল হয়। পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে সিয়ার মেজাজ সপ্তমে চড়ে থাকত। প্রায়ই লোহাগড় ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কেতনের কাছে বায়না করতেন সিয়া। শেষমেশ ১৭ জুন নিজের জন্মদিন উদ্যাপনের অজুহাত দেখিয়ে কেতনকে ফোন করেন। কেতনকে বলেন, ‘‘১৯ জুন আমার জন্মদিন। লোহাগড়ে তা পালন করতে চাই। তুমি পরিবারকে রাজি করাও।’’ প্রথমে কেতনের মা রাখি আগরওয়াল এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না। পরে সিয়ার মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে সম্মতি দেন।