আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের জানিয়েছে যে, যদি আমেরিকা ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকাঠামোর উপর বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব-আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করার প্রস্তুতি নেবে। যদি এমনটা ঘটে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল সরবরাহের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার ফলে বিশ্বের তেল সঙ্কট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রয়টার্স সূত্রে খবর, এই পরিকল্পনা নিয়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং এর বার্তা হুথি নেতৃত্বের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি এই বিষয়ে হুথি সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবেও অবহিত করা হয়েছে।
বাব-আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশে মোতায়েন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন:
রয়টার্সের প্রতিবেদনে হুথি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিদ্রোহীরা বাব-আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশে ইতিমধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করেছে এবং হামলা চালানোর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর প্রতিনিধিরাই ঠিক করবেন, কবে এবং কীভাবে এই প্রণালী বন্ধ করা হবে।
Photo: Reuters
যদি বাব-আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে তার প্রভাব আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুতর হবে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের পদক্ষেপের পর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রফতানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর লোহিত সাগর (রেড সি) বিশ্বের তেল সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলের প্রধান বিকল্প রুট হিসেবে উঠে আসে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ক্লেপলার (Kpler)-এর তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে বাব-আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৪ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশ। এক বছর আগে এই পরিমাণ ছিল প্রতিদিন প্রায় ৪২ লক্ষ ব্যারেল।
এদিকে, সৌদি আরবও তাদের সর্বাধিক তেল রফতানি লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু (Yanbu) বন্দর দিয়ে পাঠানো শুরু করেছে। পাশাপাশি, রিয়াধ লোহিত সাগর পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইনের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর বিষয়েও বিবেচনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি বাব-আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শুধু জাহাজ চলাচলই ব্যাহত হবে না, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানির দুটি প্রধান সামুদ্রিক পথ—হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগর রুট—একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক তেলবাজার দীর্ঘদিন ধরেই এমন পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে।
ভারতের উপরও পড়তে পারে গুরুতর প্রভাব:
এই সঙ্কটের প্রভাব ভারতের উপরও পড়তে পারে। ভারত তার অপরিশোধিত তেলের চাহিদার বড় একটি অংশ উপসাগরীয় দেশগুলি এবং রাশিয়া থেকে আমদানি করে। উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে আসা তেল মূলত হরমুজ প্রণালী এবং বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগর হয়ে ভারতে পৌঁছায়। অন্যদিকে, রাশিয়া থেকে আমদানি করা ইউরালস অপরিশোধিত তেল সুয়েজ খাল ও বাব-আল-মান্দেব প্রণালী পেরিয়ে ভারতের বন্দরগুলিতে আসে। যদি এই দুটি রুটই ব্যাহত হয়, তাহলে ভারতের তেল সরবরাহ, জাহাজ পরিবহণের ব্যয় এবং জ্বালানির দামের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
আমেরিকা পিছু হটতে রাজি নয়:
এদিকে, এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। মার্কিন সেনাবাহিনী শুক্রবার জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে টানা ষষ্ঠ রাতেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর মতে, যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং রণতরীর সাহায্যে ইরানের একাধিক সামরিক ঘাঁটি, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, সামরিক রসদ অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে কুয়েত, কাতার, বাহরিন এবং জর্ডনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত এবং লোহিত সাগরে সম্ভাব্য অবরোধের আশঙ্কা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক তেলবাজারকে আবারও চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।