Last Updated:
২০২৭ গোটা বিশ্বের কাছেই একটা কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে আসছে। হয়তো আমাদের সরকারি নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অন্নদাতা কৃষকদের আশীর্বাদে ভারতের মানুষ না খেয়ে মরবেন না। কিন্তু সব দেশের সেই সৌভাগ্য হবে না। কিছু শক্তিশালী দেশের কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করার লড়াই কোটি কোটি মানুষকে না খেয়ে মরার মুখে ঠেলে দিতে চলেছে।
প্রদীপ চক্রবর্ত্তী, কলকাতা: রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ চলছে। হুথি-সৌদি যুদ্ধ চলছে। ফলাফল কী হবে? সেটা বলে দিয়েছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার ফাঁকে এশিয়া কেন্দ্রিক একটা আলোচনা সভা ছিল। সেখানে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নিজের ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়েছেন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে খাদ্যসঙ্কট শুরু হবে। এবং ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর তার প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। কারণ যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে শস্য সরবরাহ প্রভাবিত হয়েছে। এবং পেট্রোলিয়াম উৎপাদক দেশগুলি যুদ্ধে জড়ানোয় রাসায়নিক সার উৎপাদনও হচ্ছে না বললেই চলে। এর প্রভাব চাষাবাদে পড়তে বাধ্য। আর ফলন কমে গেলে গরিব-মধ্যবিত্তদের পেটে লাথি পড়বে। এতে আর আশ্চর্যের কী আছে। কয়েকটা দেশ তাদের কায়েমি স্বার্থে যুদ্ধে জড়াল। আর তার জন্যে বিশ্বজুড়ে গরিবের পেটে লাথি।
বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে 4F-এর সঙ্কট ৷ ফুড, ফার্টিলাইজার, ফুয়েল ও ফিনান্স ৷ শস্য উৎপাদকরা রফতানি করতে পারছে না ৷ কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্যে জাহাজ বের হচ্ছে না ৷ রাসায়নিক সারের অভাব দেখা দিতে শুরু করেছে ৷ মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার সার উৎপাদন বাধাপ্রাপ্ত ৷ তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘সুপার এল নিনো’ ৷ কয়েক মাসেই ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কট দেখা দেবে ৷
কূটনীতিক ও মন্ত্রী মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ বছর বিদেশ দফতরে নিজেকে রগড়াচ্ছেন জয়শঙ্কর। তাই তিনি যখন বিশ্ব নিয়ে কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তখন তাকে হাল্কাভাবে নেওয়ার ঝুঁকি কেউ নেন না। তলে তলে যে অসুখের কথা সকলে টের পাচ্ছিলেন। জয়শঙ্কর তাকে হাটখোলা করে দিয়েছেন। এই যা। বিশ্বের অন্যতম দুই শস্য রফতানিকারক দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন। ২০২২ সাল থেকে দুটি দেশ পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। ফলে ইউরোপের দেশগুলি, যাদের খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়, তারা সঙ্কটে পড়েছিল। স্থির হয়েছিল, খাদ্য পরনির্ভরতা কমাতে ইউরোপের দেশগুলিই চাষাবাদে জোর দেবে। উৎপাদন বাড়াবে। কিন্তু, তার জন্যে তো রাসায়নিক সার প্রয়োজন। পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ রাসায়নিক সার সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। হরমুজ হচ্ছে পেট্রোলিয়ামের রুট। আবার রাসায়নিক সারও পেট্রোলিয়াম থেকেই তৈরি হয়। রাসায়ানিক সারের জোগান বন্ধ হওয়ার পর, মে মাসে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আপৎকালীন বৈঠক হয়েছে। তাতে বিপদের কথা সকলে স্বীকার করেছেন। বৈঠকে তর্কাতর্কি হয়েছে। কিন্তু, মীমাংসায় পৌঁছনো যায়নি। কারণ ইউরোপের দেশগুলির মধ্যেও কায়েমি স্বার্থের সংঘাত রয়েছে।
তারওপর সকলে সমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। যেমন, আয়ারল্যান্ডে সারের অভাব যতটা, ফিনল্যান্ডে ততটা নয়। তবে সুইডেন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল। সারের অভাব সকলকে ভোগাচ্ছে। তাহলে ইউরোপ কি অভুক্ত থাকবে? তা হবে কেন? ইউরোপ কি কখনও না খেয়ে থাকে? বরং ইউরোপের পেট ভরাতে কত দেশে অতীতে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। জওহরলাল নেহরু ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া বইয়ে লিখেছেন। ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লব হয়েছে বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ঘটিয়ে। এমনকি ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষও হয়েছিল ব্রিটিশ নীতির কারণেই। এখনও পশ্চিমী বিশ্বের নিঙড়ে নেওয়া মানসিকতা, গরিব দেশগুলির মানুষকে নিশ্চিত অনাহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের হিসেব বলছে, বিশ্বের ৮৩০ কোটি মানুষের মধ্যে ২৬৬ কোটি অনাহারী ৷ পৃথিবীতে প্রতি ১০ মানুষের ৩ জন উপোস করে রয়েছেন ৷ গাজা, সুদান, দক্ষিণ সুদা, ইয়েমেন, হাইতিতে দুর্ভিক্ষ চলছে আফগানিস্তানেও ভুখার মিছিল, যদিও ভারত ত্রাণ পাঠাচ্ছে ৷ শুধুই যুদ্ধের জন্যে এই পরিস্থিতি, তা নয়। করোনার সময়েই বিশ্বজুড়ে দুর্ভিক্ষ ধীরে ধীরে থাবা বসাতে শুরু করেছিল। তারপর ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে USAID বন্ধ করে দেন।
আমেরিকার ওই মানবিক খাতে খরচের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, ট্রাম্পের তৈরি করা অস্থায়ী নজরদারি সংস্থা ডজ। USAID-এর অপব্যবহারের অভিযোগ ভুরি ভুরি। তার মাঝে মানুষের পেট ভরাতেও কিছু ডলার খরচ হত। ট্রাম্প সব বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইউক্রেনের যুদ্ধে ইন্ধন দিয়ে গিয়েছেন বাইডেন। ট্রাম্প নিজে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছেন। তাতে মানুষের পেটের আগুনে ঘি ঢালা হয়েছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক কারণ। এবছরের সুপার এল-নিনো। উপোসী দেশগুলিতে মানুষ পুষ্টির সঙ্গে আপোস করছেন। কিংবা পেটের জ্বালা মেটাতে বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পাকিস্তানের প্রতি দশজনে চারজন কার্যত অভুক্ত। শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। মধ্যবিত্তরা মাসকাবারি বাজার করা কমিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের হিসেব বলছে খাদ্য সুরক্ষায় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলছে, পাঠশালার আজকের পাঠ্য কোনও দেশকে ছোট বা হেয় করা নয়। কিন্তু, তলে তলে গোটা বিশ্বকে অনাহার গ্রাস করছে।
