তানিয়া ভরদ্বাজ। একদা এই মেয়ের প্রশ্ন শুনেই চেয়ার ছেড়ে উঠে আলোচনা সভা থেকে সটান বেরিয়ে গিয়েছিলেন ‘তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তরুণী তানিয়া তখন ছিলেন প্রেসিডেন্সির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী। ১৪ বছর আগে ওই আলোচনা সভায় রাজ্যের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়েছিলেন তানিয়া। বদলে জুটেছিল, ‘সিপিএম ক্যাডার’, ‘মাওবাদী ক্যাডার’ – এইসব তকমা।
১৪ বছর পর এবিপি আনন্দ-র ‘যুক্তি তক্কো’ অনুষ্ঠানে বক্তা হয়ে এসেছিলেন সেই তানিয়া ভরদ্বাজ। ইতিমধ্যেই রাজ্যে পালাবদল ঘটেছে। গেরুয়া ঝড় এখন পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র। ৪ মে বিপুল জনাদেশে রাজ্যে প্রথমবার বিজেপি সরকার গঠন হয়েছে। ৯ মে ব্রিগেডের মেগা ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ-সহ আরও অনেকের উপস্থিতিতে রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের নতুন সরকার, আগের শাসক দল – এইসব নিয়ে কী বলছেন তানিয়া?
বক্তব্যের শুরুতেই তানিয়া বলেন, ‘১৪ বছর আগে আমায় তকমা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ১৪ বছরে বুঝেছি কীভাবে তকমা দিয়ে একজন সাধারণ মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনাকে শেষ করে দেওয়া যায়। আজকের অনুষ্ঠান আমার জন্য খুবই ব্যক্তিগত। রাজনীতিতে জয়, পরাজয় হতেই থাকে। কিন্তু এই বছরের জনাদেশ দেখিয়ে দিয়েছে বাংলার মানুষ উন্নয়ন এবং পরিবর্তনের আশায় ভোট দিয়েছে।’
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে আর জি কর কাণ্ডের ফাইল খুলেছে। এই প্রসঙ্গে তানিয়ে বলেন, ‘এই বিষয়টা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে বিগত ১৪-১৫ বছর প্রশাসনের জবাবদিহির ব্যাপারটা কীভাবে কমেছে এবং শেষ হয়ে গিয়েছে। শুরু হয়েছিল পার্কস্ট্রিটের ঘটনা দিয়ে। আক্রান্তের নামে আজেবাজে কথা বলে রাজ্যের মেয়েদের মনে ভয় আর নিরাপত্তাহীনতা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর কাটোয়া। সেই সময়েও আমরা মেয়েরা নিজেদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে এ রাজ্যের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের থেকে আমরা সুরক্ষিত তো? এরপর কামদুনিতে যখন গ্রামের সাধারণ মহিলারা বিচার চাইলেন, তখন প্রশাসন তাঁদের প্রতি সমবেদনা না দেখিয়ে, নিজেদের ডিফেন্ড করতেই ব্যস্ত ছিল। সন্দেশখালি তো গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছিল যে এ রাজ্যের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষরা নিজেদেরকে আইনেরও উপরে রাখছে। আর জি করের ঘটনা ঘটার পর ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয়েছে। সবাই রাস্তায় নেমেছিলেন প্রতিবাদ করতে। একটাই প্রশ্ন উঠেছিল, এই যে প্রশাসন রয়েছে তারা কাদের সুরক্ষার্থে রয়েছে, নিজেদের নাকি আমাদের?’
ঘর ছাড়ারাও ফিরবে ঘরে – এই লাইনটা আমার কাছে খুব ব্যক্তিগত, বলছেন তানিয়া
তানিয়ার কথায়, ‘আমরা সেই জেনারেশনের মানুষ যাঁরা বাংলাকে খুব ভালবেসে বড় হয়েছি। আর দুর্ভাগ্যবশত তারপর এখানে অনেক বাজে জিনিস স্বাভাবিক ভাবে চলতে দেখেছি। আমরা দেখেছি কাটমানি, সিন্ডিকেট কালচার, ভয়ের রাজনীতি, সাধারণ মানুষের মনে হতাশা… এই সবই এখানে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। ভয়ের রাজনীতি মানে শুধু শারীরিক অত্যাচার নয়। মনের গভীরে ঢুকে যাওয়া একটা ভয়। সিস্টেমের বিরুদ্ধে কিছু বললে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার ভয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট করার ব্যাপারে ১০ বার ভাবা, চাপ আসতে পারে। কোনও কাজ শুরুর আগে স্থানীয় কাটমানি, সিন্ডিকেট রাজের ভয়। আমি নিজে এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলাম। ২৫ বছর বয়সে আদর্শ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। মনে হয়েছিল আমি ভুল তো কিছু করছি না। ঘুষ কেন দেব? শেষ পর্যন্ত আরও অনেকের মতো আমাকেও কাজ বন্ধ করে চলে যেতে হয়। আমাদের কোনও দোষ ছিল না। গোটা সিস্টেমটাই খারাপ ছিল। কোনও ভাল কাজ করার জন্য উপযুক্ত ছিল না।’
চাকরি এবং দুর্নীতি – এই কম্বিনেশন সত্যিই অদ্ভুত
তানিয়া বলছেন, ‘শেষ ১৪-১৫ বছরে এই রাজ্যে বেশিরভাগ চাকরি দুর্নীতির মাধ্যমেই পেয়েছে লোকজন। এসএসসি দুর্নীতি, পুরসভার নিয়োগে দুর্নীতি, টাকা দিয়ে চাকরি… একটা জেনারেশনের মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল মেধার থেকে কানেকশন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ পরিবারগুলিতে শিক্ষার সঙ্গে অনেকটা আবেগ জড়িয়ে থাকে। যখন মেধা, শিক্ষা, নিয়োগ এগুলো কমতে শুরু করলে, তখন শুধু সিস্টেম নয়, গোটা সমাজব্যবস্থাটাই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। দুর্নীতিতে শুধু টাকা নয়, মানুষের আশাও হারায়। নারদা, সারদা, রোজভ্যালি – একাধিক নামে দুর্নীতি হয়েছে। আমরাও ভাবতে শুরু করলাম যে বিশ্বাসযোগ্যতা বলে আর কিছু নেই। কেউ জেলে বসে, কেউ জামিনে বেরিয়ে, কেউ হাসপাতালে বসে দায় এড়াচ্ছিল। রাজ্যে মানুষ যখন চাকরি চাইছিল, তখন চপ শিল্পের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষা, শিল্প, চাকরি চাওয়াটা শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, এর সঙ্গে অনেক মা-বাবার আবেগ জড়িয়ে রয়েছে, যাঁদের সন্তানদের বাধ্য হয়ে রাজ্য ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়েছে। মা-বাবাদের ছেড়ে দূরে চলে যেতে কেউ চায় না। কিন্তু বাধ্য হয়েছে। তাই রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়া শুধু এ রাজ্যের আর্থিক ক্ষতি নয়। ইমোশনাল লস- ও।’
তানিয়া আরও বলছেন, ‘এ রাজ্যের মানুষ খুব সাধারণ কয়েকটা জিনিস চাইছে। শিল্প হোক, তার সঙ্গে চাকরি হোক। শিক্ষা এবং এমধার গুরুত্ব বাড়ুক। মহিলারা সুরক্ষিত থাকুক। পুলিশ নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করুক। পুরনো গুন্ডারা নতুন রাজনৈতিক দলে না ঢুকুক। এই রাজ্যের রাজনীতির জলটা খুব নোংরা হয়ে গিয়েছিল। তবে আমরা জানি পদ্মফুল পরিষ্কার জলে জন্মায় না। কাদাতেই জন্মায়। এই রাজ্যের রাজনীতিটা কাদা হয়ে গিয়েছিল। নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই রাজ্যের কনফিডেন্স ফিরিয়ে আনা। বিগত কয়েকদিনে দেখলাম চিংড়িঘাটা মেট্রোর কাজ হয়েছে, ২ দিনের কাজ ছিল, এত বছর পড়েছিল। সরকারি চাকরির বয়সের ঊর্ধ্বসীমা বাড়ানো হয়েছে। অনেকদিন পর সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক পোস্ট দেখতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে এই রাজ্যে সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ হয়তো ফিরে আসছে। পুলিশ তাদের ক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে। দুর্নীতির তদন্ত হচ্ছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি একটা ভাল অধ্যায় আসতে চলেছে এই রাজ্যে। অনেক হয়েছে, মানুষ চায় এবার একটু কাজ হোক।’