LIC Stake In Rajesh Exports : দেশে কমছে না কর্পোরেট জালিয়াতির ঘটনা। এবার দেশে ধরা পড়ল আরও বড় স্ক্যাম। সৌজন্যে রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেড (Rajesh Exports)। বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবির (SEBI) দাবি অনুযায়ী ১৫ লাখ কোটির আর্থিক কারচুপি হয়েছে কোম্পানিতে। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই বড় ধাক্কা খেয়েছে বেশকিছু রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা (REL)। যার মধ্যে সবার আগে নাম রয়েছে LIC-র। এই কোম্পানিতে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ছিল বিমা সংস্থার।
কী করে কোম্পানি
ভারতের শেয়ার বাজারের তথ্য বলছে, দেশের বৃহত্তম সোনার রিফাইনার ও গহনা প্রস্তুতকারক সংস্থা হল রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেড (REL)। এই কোম্পানির বিরুদ্ধেই চরম পদক্ষেপ নিয়েছে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI)। আর্থিক অনিয়ম, রাজস্বের ভুয়ো খতিয়ান দেখানো ও তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগে সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর রাজেশ মেহতা ও কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ জারি করেছে সেবি।
কী হয়েছে রাজেশ এক্সপোর্টের শেয়ারে
আজ এই খবর সামনে আসতেই বাজারে ধস নেমেছে রাজেশ এক্সপোর্টস-এর শেয়ারে। বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির শেয়ারের দাম প্রায় ৫ শতাংশ পড়ে গিয়ে ১০৩ টাকায় ঠেকেছে। গত এক বছরে এই শেয়ারের দর প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মার খেয়েছে।
১৫.১৫ লাখ কোটির বিপুল রাজস্বে কারচুপির অভিযোগ
সেবির অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা এক কথায় চোখ কপালে তোলার মতো। সেবির দাবি, ২০২০-২১ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের মধ্যে রাজেশ এক্সপোর্টস তাদের সম্মিলিত রাজস্বে (Consolidated Revenue) প্রায় ১৫.১৫ লাখ কোটি টাকার গরমিল বা ভুল তথ্য পেশ করেছে। এই অঙ্কটি ওই নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানির দেখানো মোট রাজস্বের প্রায় ৯৯.৮০ শতাংশ!
কীভাবে হয়েছে এই আর্থিক জালিয়াতি
তদন্তে বলা হচ্ছে , কোম্পানির মোট আয়ের ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশই আসত তাদের বিদেশি সহযোগী সংস্থা, বিশেষ করে ‘ভালকাম্বি এসএ’ (Valcambi SA) থেকে। কিন্তু ভালকাম্বির নিজস্ব অডিটেড আর্থিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখে সেবি জানতে পেরেছে, মূল গ্রুপ লেভেলে যে বিপুল টাকা আয় দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার সামান্য অংশই সেখানে রয়েছে। সেবির অভিযোগ, সোনা রিফাইনিং বা প্রক্রিয়াকরণের প্রকৃত আয়ের বদলে, সম্পূর্ণ সোনার ট্রানজ্যাকশন ভ্যালু বা মোট মূল্যকে রাজস্ব হিসেবে দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছে সংস্থাটি। এর সপক্ষে কোনও সঠিক ইনভয়েস, গ্রাহকদের বিবরণ বা অ্যাকাউন্টিং নথি দেখাতে পারেনি তারা।
বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য এবং কোম্পানির বিধিবদ্ধ অডিটরদের ভূমিকা পরীক্ষা করতে জাতীয় আর্থিক রিপোর্টিং কর্তৃপক্ষ (NFRA)-এর কাছেও সুপারিশ করেছে সেবি।
বিপাকে এলআইসি (LIC), কোটি কোটি টাকা লোকসান
রাজেশ এক্সপোর্টস-এর এই চরম সংকটে বড়সড় লোকসানের মুখে পড়েছে লাইফ ইন্সুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া বা এলআইসি। দেশের এই বৃহত্তম প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সংস্থার কাছে রাজেশ এক্সপোর্টস-এর প্রায় ১০.৮০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এলআইসি এই শেয়ারে কোনো কেনাবেচা করেনি।
শেয়ারের দাম হু হু করে পড়ে যাওয়ায় এলআইসি-র এই বিনিয়োগের মূল্য বিপুল কমে গেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে যেখানে রাজেশ এক্সপোর্টসে এলআইসি-র হোল্ডিংয়ের মূল্য ছিল ৬৩৭ কোটি টাকা, তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৪৭ কোটি টাকায়।
মুখ ফেরাচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও (FIIs)
শুধু এলআইসি নয়, ধাক্কা খেয়েছেন বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরাও (FII)। তবে কোম্পানির ডামাডোল আঁচ করতে পেরে গত তিন বছর ধরে ক্রমাগত নিজেদের অংশীদারি কমাচ্ছিলেন তারা। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে যেখানে এফআইআই-দের হোল্ডিং ছিল ১৭.৬০ শতাংশ, ২০২৬ সালের মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.২৬ শতাংশে। বর্তমানে এই কোম্পানিতে মূলত ব্রিজ ইন্ডিয়া ফান্ড (৮.৪৬ শতাংশ) এবং সোয়াব ফান্ডামেন্টাল এমার্জিং মার্কেটস ইকুইটি ইটিএফ (২.৭০ শতাংশ)-এর বড় বিনিয়োগ রয়েছে। তবে বর্তমান পতনের জেরে এফআইআই-দের হোল্ডিংয়ের মূল্যও ৮৩৮ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৫৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
আগেও ছিল নজরদারিতে
রাজেশ এক্সপোর্টস-এর আর্থিক অস্বচ্ছতা নিয়ে এই প্রথম প্রশ্ন উঠল তা নয়। ২০২৩ সালেও ২০২৩ অর্থবর্ষের ক্যাশ-ফ্লো স্টেটমেন্ট বা নগদ প্রবাহের বিবরণী জমা না দেওয়ায় ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) কোম্পানির কাছে জবাবদিহি চেয়েছিল। এমনকি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকেও অডিট রিপোর্ট এবং ক্যাশ-ফ্লোর সঠিক তথ্য গোপন করার অভিযোগ উঠেছিল এই গোল্ড জায়ান্টের বিরুদ্ধে। এবার সেবির এই কড়া পদক্ষেপের পর আগামী দিনে রাজেশ মেহতা ও তার সংস্থার ভবিষ্যৎ কোন দিকে ঘোরে, সেদিকেই নজর ওয়াকিবহাল মহলের।
আরও পড়ুন : দেশে এবার বিরাট বড় স্ক্যাম! টাকার অঙ্ক বিস্ময়কর, ১,৫১,৫০,০০,০০,০০,০০০, কী বলছে SEBI?