CNN-News18-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে গড়করি ইথানল মিশ্রণ নিয়ে সমালোচনাকে উড়িয়ে দেন এবং জৈব জ্বালানি, হাইড্রোজেন ও বৈদ্যুতিক যানবাহননির্ভর ভবিষ্যতের পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর মতে, জ্বালানি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার অন্যতম মূল ভিত্তি।
গড়করি বলেন, “ভারতকে আমদানিকৃত জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে হবে। সাম্প্রতিক পশ্চিম এশিয়া সঙ্কট দেখিয়ে দিয়েছে, জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা একটি দেশকে কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। জ্বালানি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।”
‘পচা ফল থেকেও ইথানল তৈরি করা সম্ভব’:
ইথানল উৎপাদনের জন্য খাদ্যশস্য ব্যবহারের ফলে তা খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ কমে যায়— এই সমালোচনার জবাবে গড়করি বলেন, এটি জৈব জ্বালানি সম্পর্কে সীমিত ধারণার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “শহরকেন্দ্রিক এবং কেন্দ্রীভূত চিন্তাধারার মানুষ এ ধরনের যুক্তি দেন যে ইথানল মানেই শুধু অ্যালকোহল। কিন্তু ইথানল নানা ধরনের উৎস থেকে উৎপাদন করা যায়। এমনকি, পচে যাওয়া ফল এবং সবজি থেকেও ইথানল তৈরি করা সম্ভব।”
তিনি বলেন, ইথানল উৎপাদনের জন্য শুধুমাত্র খাদ্যশস্যের উপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। কৃষিজ বর্জ্য এবং অন্যান্য জৈব উপাদান, যা অন্যথায় অব্যবহৃত থেকে যেত, সেগুলিও ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা যদি জ্বালানির ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হতে পারি, তাহলে তা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উপকারী হবে এবং দূষণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।”
‘ই২০ নিরাপদ, ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে’:
ই২০ পেট্রোল এবং ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির কারণে গাড়িতে সমস্যা হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে গড়করি বলেন, বিকল্প জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের রোডম্যাপ সবসময়ই স্বচ্ছ ছিল এবং সমালোচনার বড় অংশই তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “জনসাধারণ প্রকৃত তথ্য সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত। বিকল্প জৈব জ্বালানির দিকে রূপান্তরের নীতি এবং রোডম্যাপ প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছভাবে আলোচনা করা হয়েছে এবং জানানো হয়েছে। এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হল জ্বালানিতে আত্মনির্ভরতা অর্জন এবং আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা।”
মন্ত্রী আরও দাবি করেন, গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য নিয়মিতভাবে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানিকে দায়ী করা ঠিক নয়, কারণ কোনও গাড়ি প্রযুক্তিই সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়।
তিনি বলেন, “যে কোনও যন্ত্রের মতোই গাড়িতেও ত্রুটি দেখা দিতে পারে। কোনও প্রযুক্তিই শতভাগ নিখুঁত নয়। যদি কোনও গাড়িতে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে মালিকদের উচিত সেটি ডিলারের কাছে পরীক্ষা করানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিমার সুবিধা গ্রহণ করা। প্রতিটি যান্ত্রিক সমস্যার জন্য ইথানল মিশ্রণকে দায়ী করা যায় না।”
ই২০ জ্বালানি নিয়ে কেন্দ্রের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে গড়করি বলেন, বর্তমানে ব্যবহৃত এবং নতুন— উভয় ধরনের গাড়িই নিরাপদে ই২০ ব্যবহার করতে সক্ষম। তিনি বলেন, “ই২০ জ্বালানি পুরনো এবং নতুন— দুই ধরনের গাড়ির জন্যই নিরাপদ। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, আর কিছু সমালোচনা তথ্যভিত্তিক নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
কীভাবে ইথানল ভুট্টার বাজারকে বদলে দিয়েছে:
গড়করি আরও বলেন, ভুট্টা থেকে ইথানল উৎপাদনকে উৎসাহিত করার সরকারি সিদ্ধান্ত কৃষকদের কীভাবে উপকৃত করেছে, সেটি এর একটি উদাহরণ। তিনি বলেন, “আমরা ভুট্টা থেকে ইথানল উৎপাদনকে উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং মন্ত্রিসভা সেই সিদ্ধান্তে অনুমোদন দেয়।”
মন্ত্রীর মতে, এই নীতি কার্যকর হওয়ার পর ভুট্টার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তিনি বলেন, “সেই সময় বাজারে ভুট্টার দাম ছিল প্রতি কুইন্টাল প্রায় ১,২০০ টাকা, যেখানে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) ছিল প্রতি কুইন্টাল ১,৮০০ টাকা। সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভুট্টার দাম বেড়ে প্রায় ২,৮০০ টাকা প্রতি কুইন্টালে পৌঁছে যায়।”
জ্বালানি আমদানিতে খরচ হয়েছে ২২ লক্ষ কোটি টাকা:
বিকল্প জ্বালানির পক্ষে অর্থনৈতিক যুক্তি তুলে ধরে গড়করি বলেন, গত দুই দশকে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে ভারত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে। তিনি বলেন, “২০০৪ সাল থেকে ভারত প্রায় ২২ লক্ষ কোটি টাকার জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করেছে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। তাঁর কথায়, “ভারতের বায়ুদূষণের প্রায় ৪০ শতাংশই পরিবহণ খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দূষণ কমানোই আমার লক্ষ্য।”
পরিকল্পনার অংশ হাইড্রোজেন ও বৈদ্যুতিক যানবাহনও:
ইথানলের পক্ষে সওয়াল করলেও গড়করি জোর দিয়ে বলেন, এটি সরকারের পরিচ্ছন্ন পরিবহণ কৌশলের মাত্র একটি স্তম্ভ। তিনি বলেন, “আমি হাইড্রোজেনকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পক্ষেও জোরালোভাবে সমর্থন করি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহারকেও উৎসাহিত করি।”