রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিদেশ থেকে অতিরিক্ত কেনাকাটা কমানো এবং ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, আমেরিকা ও ইরানকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা এবং ভারতীয় টাকার উপর চাপ বাড়ার উদ্বেগের মধ্যেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা এড়াতে এবং দেশের স্বার্থে বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় করার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। ভারত কেন সোনা ও রুপোর আমদানি শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল?
১) সোনা ও রুপোর আমদানি কমানোর চেষ্টা
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সোনা ব্যবহারকারী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম ভারত। দেশের প্রায় পুরো সোনার চাহিদাই মেটানো হয় বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, শেয়ার বাজারে অস্থিরতা এবং সোনার দাম বৃদ্ধির কারণে সোনায় বিনিয়োগের ঝোঁক বেড়েছে। ফলে গোল্ড-ভিত্তিক বিনিয়োগেও বড় অঙ্কের টাকা আসছে।
World Gold Council-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ত্রৈমাসিকে ভারতে গোল্ড এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ETF)-এ বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ১৮৬ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ২০ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে।
বিদেশ থেকে বেশি সোনা ও রুপো আমদানি হলে দেশের বেশি পরিমাণ ডলার বাইরে চলে যায়।
তাই আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে সরকার সোনা ও রুপোকে আরও দামি করতে চাইছে, যাতে চাহিদা কিছুটা কমে এবং আমদানিও নিয়ন্ত্রণে আসে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একটি কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তাই আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি। পিটিআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, Senco Gold-এর সিইও ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর শুভঙ্কে সেন বলেছেন, দেশের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিটের উপর চাপ বাড়ছে, তাই আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে গয়না শিল্পের ‘হেভিওয়েট’দর বক্তব্য, ভারতের ঘরবাড়ি, মন্দির এবং বিভিন্ন বিনিয়োগে ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ সোনা মজুত রয়েছে।
তাঁদের মতে, পুরনো সোনা রিসাইকেল করা, বদল করে ব্যবহার করা, ফের কাজে লাগানো এবং সোনাকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আনা গেলে নতুন করে বিদেশ থেকে সোনা আমদানির প্রয়োজন অনেকটাই কমানো যাবে। এতে সাধারণ মানুষের চাহিদাতেও খুব বেশি প্রভাব পড়বে না।
২) ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের উপর চাপ কমানো
আমদানি শুল্ক বাড়ানোর আরেকটি বড় কারণ হল ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখা।
সোনা আমদানি করতে হলে মার্কিন ডলারে টাকা দিতে হয়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। তাই সরকার বৈদেশিক মুদ্রার খরচ কমানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে জ্বালানির ব্যবহার কমানো, বিদেশ সফর কিছুদিনের জন্য পিছিয়ে দেওয়া এবং এক বছরের জন্য সোনা কেনা এড়ানোর আর্জি জানিয়েছিলেন। এর মূল লক্ষ্য হল, দেশের অর্থনীতি শক্ষিশালী করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বাঁচিয়ে রাখা। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমদানি কমানোর জন্য ভারত ইতিমধ্যেই কয়েকটি পদক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে সোনা ও রুপো আমদানির উপর ৩ শতাংশ ইন্টিগ্রেটেড গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (IGST) বসানো হয়েছে। এর ফলে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ব্যাঙ্কগুলির সোনা আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। ফলে এপ্রিল মাসে ভারতে সোনা আমদানি ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল। পরে ব্যাঙ্কগুলি আবার কেনাকাটা শুরু করলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে আমদানি শুল্ক বাড়ানোর পর আগামী দিনে সোনা ও রুপোর আমদানি আরও কমতে পারে।
৩) টাকাকে আরও শক্ষিশালী বানানো
বিশেষজ্ঞদের মত, ভারতীয় টাকাকে আরও শক্ষিশালী বানাতেও আমদানি শুল্ক বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পিটিআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কার জেরে ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকা ৪০ পয়সা কমে নতুন সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তর ৯৫.৬৮-এ বন্ধ হয়েছে। অপরিশোধিত তেল ও সোনার মতো দামি পণ্যের আমদানি বাড়লে দেশে ডলারের চাহিদাও বেড়ে যায়। এতে ভারতীয় টাকা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই সোনার মতো খুব জরুরি নয়, এমন জিনিসের আমদানি কমিয়ে সরকার ডলার বাইরে যাওয়া কমাতে এবং টাকার স্থিতি বজায় রাখতে চাইছে। বিদেশি মুদ্রা বাজারের বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, আমদানি কমানো ও জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘদিন বেশি থাকলে ভারতের ব্যালান্স অফ পেমেন্টসের উপর চাপ বাড়তে পারে।