ইন্দিরা গান্ধির আমলের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অরুণ মৈত্র৷ শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করে যাওয়া গুরুদাস দাশগুপ্ত৷ বাংলার এই দুই প্রবাদপ্রতিম রাজনীতিকের সঙ্গেই ‘রক্তের সম্পর্ক’ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের৷ এদিন মায়ের রাজনৈতিক জীবনের এহেন সন্ধিক্ষণে তাঁকে তাঁর পূর্বপুরুষদের কথা মনে করিয়ে দিলেন ছেলে বৈদ্যনাথ৷
লেখার শুরুটা ছিল এমন, ‘রাজনীতি একটি সভ্য সমাজের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে রাজনীতির পবিত্র আদর্শ বহু ক্ষেত্রেই দুর্নীতি, অপরাধ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিস্বার্থের অন্ধ প্রতিযোগিতার কাছে পরাজিত হচ্ছে’।
বৈদ্যনাথ লেখেন, ‘দুর্নীতি আজ অনেক ক্ষেত্রে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে যে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে এর প্রতি অসহায় ও নিরুৎসাহ হয়ে পড়ছে। জনকল্যাণের জন্য বরাদ্দ অর্থ যখন আত্মসাৎ হয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যখন অর্থ ও প্রভাবের বিনিময়ে পরিচালিত হয়, তখন গণতন্ত্রের প্রকৃত চেতনাই আহত হয়। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, ন্যায়বোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার উপর এক গভীর আঘাত। যে সমাজে সততার চেয়ে প্রভাব ও অর্থের মূল্য বেশি হয়ে ওঠে, সেখানে যোগ্যতা ও নৈতিকতা অবহেলিত হতে বাধ্য’।
তিনি লেখেন, ‘এর থেকেও ভয়ঙ্কর হল রাজনীতির সঙ্গে অপরাধমূলক শক্তির সংযোগ। যখন অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয় পায়, তখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। সমাজে ভয়, হিংসা এবং অসহিষ্ণুতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়। রাজনীতি তখন আর মানুষের সেবার ক্ষেত্র থাকে না; তা পরিণত হয় ক্ষমতা দখল ও প্রভাব বিস্তারের যন্ত্রে।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের অন্য এক পথও দেখায়। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন— সর্বত্র আমরা দেখেছি আদর্শনিষ্ঠ নেতৃত্বের শক্তি। সত্য, ন্যায়, আত্মত্যাগ এবং মানবিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করেই সমাজে স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে। প্রকৃত নেতা তিনি নন, যিনি কেবল ক্ষমতার শিখরে পৌঁছান; প্রকৃত নেতা তিনি, যিনি মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন তাঁর সততা ও নৈতিক দৃঢ়তার মাধ্যমে।
আজকের সময়ে তাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পুনর্জাগরণ। এমন এক রাজনীতি, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মানুষের কল্যাণ বড় হবে; যেখানে অপরাধ ও দুর্নীতির সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না; যেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করবে না’।
এরপরেই পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করতে দেখা যায় বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদারকে৷ তিনি লেখেন, ‘আমি আশা করি আমার মা আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতির পথেই অটল থাকবেন—অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নির্ভীক অবস্থান গ্রহণ করবেন এবং গুরুদাস দাশগুপ্তের ( Gurudas Dasgupta) আদর্শকে জীবনপথের প্রেরণা হিসেবে ধারণ করবেন। যিনি সারাজীবন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং রাজপথ থেকে সংসদের অন্দরমহল পর্যন্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই চালিয়ে গেছেন। মায়ের সামনে একটা বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। ঠিক করতে হবে তিনি Gurudas Dasgupta এবং Arun Moitra-র আদর্শ অনুসরণ করবেন কিনা’।
অন্যদিকে, কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মামা বাম নেতা গুরুদাস দাশগুপ্ত সারাজীবন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন। হর্ষদ মেহতা কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে তিনি সংসদে সরব হয়েছিলেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে নির্ভয়ে কথা বলেছিলেন। বোম্বেতে বহুজাতিক কোম্পানির দুর্নীতিও তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন। এর জন্য অনেক শিল্পপতি তাঁকে নির্বাচনে হারানোর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করেছিলেন বলে নিজের পোস্ট লিখেছেন বৈদ্যনাথ।
সবশেষে মা’কে ছেলের বার্তা, ‘গুরগাঁওয়ে শ্রমিকদের উপর পুলিশ গুলি চালালে, নিহত এক শ্রমিকের রক্তমাখা জামা নিয়ে গুরদাস দাশগুপ্ত সংসদে গিয়েছিলেন, যাতে দেশের মানুষ সত্যিটা জানতে পারে। আজ আমার মায়েরও সাহস দেখানোর সময় এসেছে। গুরদাস দাশগুপ্ত ও অরুণ মৈত্রের আদর্শ মেনে সত্য ও ন্যায়ের পথে দাঁড়াতে হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে’।