আগামী ১৫ থেকে ১৭ জুন ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ শহরে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। অংশীদার দেশ হিসেবে ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং ফরাসি বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যেই সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কোনও ঘোষণা এখনও হয়নি, তবে দুই নেতাই সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন বলে সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সম্মেলনের ফাঁকে তাঁদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত বৈঠক বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
জি-৭ সম্মেলনে মোদি-ট্রাম্প সাক্ষাৎ হলে তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হবে। কারণ, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির ওয়াশিংটন সফরের পর এই প্রথম দুই নেতার সরাসরি সাক্ষাৎ হতে পারে। ওই সময়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের জন্য হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সম্মেলন দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় করা এবং বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারে।
সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ রবিন্দর সচদেব জানান, ভারত ও আমেরিকার মধ্যে চলমান দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে জি-৭ সম্মেলনে মোদি-ট্রাম্প বৈঠকের সম্ভাবনা ‘অত্যন্ত বেশি’। সম্ভাব্য আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি, যা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সচদেবের মতে, মার্কিন শুল্ক সংক্রান্ত পদক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে চলমান আইনি পর্যালোচনার কারণে আলোচনা বর্তমানে কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, “বাণিজ্য চুক্তি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।” দুই নেতা সাক্ষাৎ করলে উভয় পক্ষই বিষয়টি নিয়ে আরও স্পষ্টতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার চেষ্টা করবেন বলে মনে করা হচ্ছে। বাণিজ্যের পাশাপাশি চলতি বছরের শেষদিকে ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কোয়াড সম্মেলনের প্রস্তুতিও আলোচনায় উঠে আসতে পারে। এএনআই সূত্রে জানা গিয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের কূটনৈতিক তৎপরতা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৃহত্তর সমন্বয়ের ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া সম্ভাব্য মোদি-ট্রাম্প বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বিষয়গুলিও আলোচনায় আসতে পারে।
এদিকে, এএনআই জানিয়েছে যে, জি-৭ বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ফ্রান্সের ইউরোপ ও বিদেশ বিষয়ক মন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারোর সঙ্গে বৈঠক করেন। ফরাসি বিদেশ মন্ত্রকের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দুই মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জি-৭ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং “বৃহৎ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা” সংক্রান্ত আলোচনায় ভারতের অবদানের প্রশংসাও করা হয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্রিকসের সভাপতিত্বকারী দেশ হিসেবে ভারতের অংশগ্রহণকে ফ্রান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
জয়শঙ্কর এবং বারো পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উপর প্রভাব নিয়েও আলোচনা করেন। ফরাসি বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে এএনআই জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উভয় দেশ ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের এক আধিকারিকের উদ্ধৃতি দিয়ে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেবেন। এএনআইও সেই তথ্য উল্লেখ করেছে। এই বছরের জি-৭ সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, অভিবাসন এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্মেলনে ট্রাম্প মার্কিন প্রযুক্তিতে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানো এবং চিনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমানোর পক্ষে সওয়াল করতে পারেন। এমন এক সময়ে এই জি-৭ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরান ইস্যু এবং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের একাধিক মিত্র দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বৃদ্ধি পেয়েছে। হোয়াইট হাউসের মতে, এই সম্মেলনে তাৎক্ষণিক ভাবে বড় কোনও চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলেও ভবিষ্যতের চুক্তি এবং কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করা হবে।