শীর্ষ নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভ আন্দোলন। সেখানে মুনির সেনা ও গোয়েন্দা প্রধানদের নির্দেশ দেন, “যে কোনও উপায়ে যত দ্রুত সম্ভব পিওকে-র সঙ্কটের সমাধান করতে হবে।” বৈঠকে উপত্যকায় চলমান বিক্ষোভ বন্ধ করতে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয় বলে সূত্রের দাবি।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিল ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি), একটি নাগরিক সমাজভিত্তিক সংগঠন, যাকে সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে পাকিস্তান সরকার। সংঘর্ষের পর একাধিক এলাকায় কড়া বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে, কিছু অঞ্চলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বিক্ষোভের নেতাদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় শুরু হয়েছে। পরে জেএএসি-র গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং তাঁদের সন্ধান দিলে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও করা হয়েছে।
জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি প্রথম আলোচনায় আসে ২০২৪ সালে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, গমের দাম বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে বড় আন্দোলনের মাধ্যমে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময় আন্দোলনকারীরা প্রশাসনকে একাধিক দাবিতে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছিল। এর ফলে সংগঠনটির জনসমর্থনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তবে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে অসন্তোষ কখনও পুরোপুরি দূর হয়নি।
পাকিস্তান সরকারের দাবি, জেএএসি জনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। যদিও আন্দোলনের নেতারা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, তাঁরা শুধুমাত্র স্থানীয় মানুষের অধিকার ও গণতান্ত্রিক দাবির প্রতিনিধিত্ব করছেন।
অর্থনৈতিক সমস্যাগুলি আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করলেও সাম্প্রতিক অশান্তির তাৎক্ষণিক কারণ ছিল বিধানসভার ১২টি সংরক্ষিত আসন নিয়ে বিতর্ক।
এই আসনগুলি পাকিস্তানে বসবাসকারী জম্মু ও কাশ্মীরের উদ্বাস্তুদের জন্য সংরক্ষিত। জেএএসি এবং অন্যান্য স্থানীয় সংগঠনের অভিযোগ, এই ব্যবস্থার ফলে পিওকে-র বাইরে বসবাসকারী ব্যক্তিরা রাজনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করছেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান সরকারের দাবি, এই আসনগুলি সাংবিধানিক ব্যবস্থার অংশ এবং সহজে বাতিল করা সম্ভব নয়। আদালতও সম্প্রতি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে বহাল রাখার পক্ষে রায় দেওয়ায় জনরোষ আরও বেড়ে যায় এবং নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়।
হিংসার সূত্রপাত নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য একেবারে ভিন্ন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানি প্রশাসনের দাবি, আন্দোলনকারীরাই প্রথমে সহিংসতা শুরু করে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের উপর হামলা চালায়।
তবে অশান্তির ব্যাপকতা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। রাওয়ালাকোট ছাড়াও মুজাফফরাবাদ, মিরপুর-সহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, পরিবহণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং একাধিক জেলায় স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রশাসনকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে গণগ্রেফতার, ইন্টারনেট বন্ধ এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইসলামাবাদ এই ঘটনাকে মূলত আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে তুলে ধরছে। সরকার জেএএসি-কে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে দাবি করেছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং আন্দোলনের সংগঠকদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। কিছু পাকিস্তানি আধিকারিক অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনের কিছু অংশের সঙ্গে বিদেশি শক্তির যোগাযোগ থাকতে পারে। যদিও আন্দোলনের নেতারা সেই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।
এদিকে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী Faisal Mumtaz Rathore জানিয়েছেন, সরকার আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে উদ্বাস্তুদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মতো কিছু সাংবিধানিক বিষয় নিয়ে আপসের সুযোগ নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন।
পিওকে-র এই অশান্তিকে পাকিস্তানের প্রশাসনিক ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে ভারত।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র Randhir Jaiswal সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, “নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার জন্য ভারতকে দায়ী করার পাকিস্তানের চেষ্টা কখনও সফল হবে না।”
ভারত আন্তর্জাতিক মহলকেও বিষয়টির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। নয়াদিল্লির মতে, এই হিংসা পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের প্রশাসনিক কাঠামোর গভীর সমস্যার প্রতিফলন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
পাকিস্তানের কিছু নেতা ও সংবাদমাধ্যম ভারতের বিরুদ্ধে পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর অভিযোগ তুললেও, ভারত সেই অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে।