দিল্লিতে আয়োজিত মিউনিখ লিডার্স মিটিংয়ে বক্তৃতা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ও পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেন জয়শঙ্কর।
জয়শঙ্কর বলেন, “এই ঘরে উপস্থিত কেউই সম্ভবত এই বিষয়ে দ্বিমত করবেন না যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি মূলত আমেরিকার অবস্থানের আমূল পরিবর্তনের দ্বারা চিহ্নিত। এই পরিবর্তনটি একটি সচেতন পছন্দের ভিত্তিতে নেওয়া অবস্থান এবং এক অর্থে আমেরিকা ইচ্ছাকৃতভাবেই নিজেকে আরও একাকী শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে।”
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর মতে, চিন নিজেকে একটি ‘অনন্য দেশ’ হিসেবে দেখে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চিনের অবস্থানের বাস্তবতাও সেই আত্মধারণাকে সমর্থন করে।
জয়শঙ্করের কথায়, “বিশ্ব পরিস্থিতির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য অবশ্যই চিনের উত্থান। চিন নিজেকে একটি অনন্য দেশ হিসেবে দেখে। এক অর্থে এটি যেমন তাদের নিজেদের সম্পর্কে ধারণা, তেমনই অনেক দিক থেকে তা বাস্তবতাও।”
বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু আমেরিকা ও চিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বলেও মন্তব্য করেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, বিভিন্ন দেশ নিজেদের হাতে থাকা যে কোনও ধরনের প্রভাব বা শক্তিকে এখন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
একইসঙ্গে তিনি বলেন, কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়লেও দেশগুলির মধ্যে গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও রয়েছে।
বিদেশমন্ত্রীর কথায়, “আমরা অত্যন্ত তীব্র প্রতিযোগিতার পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। এই প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু এই দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর ফলে যে কোনও দেশ নিজেদের হাতে থাকা যে কোনও ধরনের প্রভাব বা শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আর এই প্রতিযোগিতা একইসঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার জটিল বাস্তবতার সঙ্গেও সহাবস্থান করছে।”
ইরান সংঘাত নিয়েও বক্তব্য রাখেন বিদেশমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য এবং মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়াই ভারতের প্রধান উদ্বেগ।
জয়শঙ্কর উল্লেখ করেন, ভারত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা NPT (Nuclear Non-Proliferation Treaty)-তে স্বাক্ষর করেনি এবং নিজের অধিকার সংরক্ষণ করেছে। অন্যদিকে ইরান NPT-তে স্বাক্ষর করেছে। ফলে দুই দেশের পরিস্থিতি এক নয় বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
জয়শঙ্করের কথায়, “ইরান প্রসঙ্গে ভারত এমন একটি দেশ, যারা NPT-তে স্বাক্ষর করেনি এবং নিজেদের অধিকার সংরক্ষণ করেছে। ইরান NPT-তে স্বাক্ষর করেছে। ফলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের কাছে এই মুহূর্তে প্রধান উদ্বেগ হল এই সংঘাতের ফলে জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।”
একইসঙ্গে ইরান সংঘাতের যে কোনও সমাধান আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে ভারত আশা করে বলেও জানান বিদেশমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, “জ্বালানির বাজার অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে মানুষের রান্নাঘর, কর্মসংস্থান এবং জীবিকা সরাসরি জড়িত। এগুলিই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা মূলত বিশ্বের ওই অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল ছিলাম।”
জয়শঙ্কর বলেন, অস্থির জ্বালানি বাজার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান এবং পরিবারের খরচের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত জ্বালানি ও বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আমরা এখন জ্বালানি, বাণিজ্য এবং মানুষের যাতায়াতের অবাধ প্রবাহ পুনরুদ্ধার হতে দেখতে চাই। কারণ এমন কিছু সংঘাতের মূল্য আমাদের বিভিন্নভাবে দিতে হচ্ছে, যার সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই এবং যেগুলি অনেক সময় আমাদের থেকে বহু দূরে সংঘটিত হচ্ছে।”
মিউনিখ লিডার্স মিটিং আয়োজন করে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স। এই বৈঠকে বিদেশনীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৮০ জন পর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞ অংশ নেন।
বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে বছরে এক বা দু’বার এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট কোনও অঞ্চল বা বিষয়কে কেন্দ্র করে বিদেশনীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকগুলি Chatham House Rule মেনে বন্ধ দরজার আড়ালে অনুষ্ঠিত হয়, যাতে অংশগ্রহণকারীরা আরও খোলামেলাভাবে মতামত জানাতে পারেন।