আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ধনী ও মধ্যবিত্তের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য শুধু আয়ের নয়, বরং অর্থ ব্যবহারের মানসিকতা ও জ্ঞানের। অনেক সময় ভাল রোজগার করা মানুষও ভুল অভ্যাসের কারণে ধীরে ধীরে সম্পদ হারিয়ে ফেলেন। আবার সীমিত বেতনের মধ্যেও অনেকে সঠিক বিনিয়োগ ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে বড় সম্পদ গড়ে তোলেন।
দেখনদারির জন্য ঋণ নেওয়া
দামী ফোন, বিলাসবহুল গাড়ি, ব্র্যান্ডেড লাইফস্টাইল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ধনী দেখানোর প্রতিযোগিতা আজ মধ্যবিত্তের অন্যতম বড় আর্থিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই এমন জিনিস কেনার জন্য পার্সোনাল লোন বা ক্রেডিট কার্ড EMI-র উপর নির্ভর করেন, যেগুলির মূল্য সময়ের সঙ্গে কমতে থাকে।
ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানারদের মতে, ধনী দেখানো আর সত্যিই ধনী হওয়ার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। যেসব জিনিস ভবিষ্যতে আয় বাড়ায় না, সেগুলির জন্য ঋণ নেওয়া আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় অনেক বিনিয়োগকারী অত্যন্ত কম দামের পেনি স্টকে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেন। তাঁদের ধারণা, শেয়ারের দাম সামান্য বাড়লেই বড় লাভ হবে। কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের শেয়ারে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
এই সংস্থাগুলির উপর প্রায়শই বড় ঋণের বোঝা থাকে, ব্যবসা দুর্বল হয় এবং ট্রেডিং ভলিউমও কম থাকে। ফলে অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা সেই শেয়ারে আটকে যান এবং বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পেনি স্টকে মোট পোর্টফোলিওর খুব ছোট অংশই রাখা উচিত।
অনেক চাকরিজীবী মানুষ মনে করেন, ট্যাক্স সেভিং মানেই 80C-র ১.৫ লক্ষ টাকার সীমার মধ্যে LIC বা PPF-এ বিনিয়োগ করা। কিন্তু কর সাশ্রয়ের আরও বহু বৈধ উপায় রয়েছে, যেগুলি অধিকাংশ মানুষ ব্যবহার করেন না।
যেমন— NPS-এ অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যবিমায় কর ছাড় এবং হোম লোনের সুদের উপর ট্যাক্স বেনিফিট দীর্ঘমেয়াদে বড় সঞ্চয় এনে দিতে পারে। সঠিক ট্যাক্স পরিকল্পনা আপনার কষ্টার্জিত আয়ের বড় অংশ বাঁচাতে সাহায্য করে।
আজও বহু মানুষ তাঁদের সমস্ত সঞ্চয় সেভিংস অ্যাকাউন্ট বা ফিক্সড ডিপোজিট (FD)-এ রেখে দেন। তাঁদের মনে হয় টাকা নিরাপদে রয়েছে। কিন্তু আসল সমস্যা হল মূল্যবৃদ্ধি।
যদি FD থেকে ৫-৬ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া যায় অথচ মূল্যবৃদ্ধির হার তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে বাস্তবে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ গড়তে মিউচুয়াল ফান্ড, SIP, ইক্যুইটি ও ইনডেক্স ফান্ডকে অনেক বেশি কার্যকর মনে করা হয়, কারণ এতে কম্পাউন্ডিংয়ের সুবিধা পাওয়া যায়।
মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে একটি বড় মেডিক্যাল জরুরি অবস্থা বা চাকরি চলে যাওয়া পুরো আর্থিক পরিকল্পনাকে ভেঙে দিতে পারে। অনেকেই বাধ্য হয়ে বিনিয়োগ ভেঙে ফেলেন, যার প্রভাব ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তত ৬ মাসের খরচের সমান একটি ইমার্জেন্সি ফান্ড আলাদা রাখা উচিত। পাশাপাশি পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিমা এবং টার্ম ইন্স্যুরেন্স অত্যন্ত জরুরি।
বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো একটি মাত্র বেতনের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এটিই একদিকে শক্তি, অন্যদিকে বড় ঝুঁকি। চাকরি চলে গেলে বা আয় বন্ধ হলে পুরো বাজেট ভেঙে পড়তে পারে।
এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা প্যাসিভ ইনকামের উপর জোর দেন। ডিভিডেন্ড দেওয়া শেয়ার, ভাড়া থেকে আয় বা ছোট সাইড বিজনেস ভবিষ্যতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা দিতে পারে।
অনেকে গাড়ি, মোবাইল বা সোনার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেন, কিন্তু নিজের আর্থিক জ্ঞান বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেন না। অথচ বাজারের নিয়ম, কর ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগের পদ্ধতি নিয়মিত বদলাচ্ছে।
যে ব্যক্তি শেখা বন্ধ করে দেন, তিনি ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়েন। আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টাকা রোজগার করাই যথেষ্ট নয়— সেই টাকা সঠিকভাবে পরিচালনা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাসই মধ্যবিত্তকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করে তুলতে পারে।