জয়পুর: আগুনে পুড়ে ছাই একই পরিবারের চার জন। ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ভেবেই তদন্ত শুরু হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত যত এগোতে শুরু করে, জট খুলতে শুরু করে ক্রমশ। শেষে দেখা গেল, গোটা ঘটনার নেপথ্যে বাড়ির নাবালক সদস্য। ক্রাইম থ্রিলারের পোকা ওই নাবালক, বেশ কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করে গোটা কাণ্ড ঘটিয়েছে। (Ajmer Murder Case)
রাজস্থানের অজমের থেকে এই ঘটনা সামনে এসেছে। সম্প্রতি গাড়ির মধ্যে থেকে দেহ উদ্ধার হয় রাম সিংহ চৌধরি, তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, মা এবং ভাইঝির। প্রাথমিক ভাবে ধারণা জন্মায়, গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে থাকবে। সেই থেকে হয়ত আগুন ধরে গিয়ে থাকবে। গাড়ি থেকে বেরোতে না পেরে মারা গিয়ে থাকবেন চারজন। (Rajasthan Murder Case)
ভয়ঙ্কর খুনের ঘটনা অজমেরে
কিন্তু তদন্তে নেমে রাম সিংহের ১৭ বছরের ছেলের আচরণ দেখে সন্দেহ জাগে পুলিশের। সেই সন্দেহই অপরাধের শিকড়ে পৌঁছতে সাহায্য় করে তাদের। রাজস্থানে এযাবৎ যত অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছে, এই ঘটনা সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। পারিবারিক টানাপোড়েন, সম্পত্তির ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্ব, ঈর্ষা থেকেই জল এতদূর গড়াল এবং নাবালককে অপরাধ ঘটানোর দিকে ঠেলে দিল বলে মনে করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার তদন্ত বদলে গেল খুনে
রাজস্থান পুলিশ জানিয়েছে, গাড়ির মধ্যে থেকে দেহ উদ্ধার হয় গ্রামের প্রধান রাম সিংহ, তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী সুরজ্ঞান দেবী, মা পুসী দেবী এবং ভাইঝি মহিমার। গোটা ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। রাম সিংহের প্রথম স্ত্রীও ভেঙে পড়েন একেবারে। কান্নাকাটি করছিলেন পরিবারের সকলে। কিন্তু রাম সিংহের বড় ছেলে একেবারে নির্বিকার ছিল। কোনও রকম শোক, উত্তেজনা বা অস্থিরতা তো দূর, বরং তাকে অস্বাভাবিক রকমের শান্ত এবং ধীরস্থির লাগে পুলিশের।
আরও পড়ুন: গাজ়ার ৭০% দখল করার নির্দেশ দিলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, নতুন করে যুদ্ধের আগুনে পুড়বে পশ্চিম এশিয়া!
নাবালক ছেলের হাতে খুন পরিবার
পুলিশ বাড়িতে গিয়ে দেখে, রাম সিংয়ের প্রথম স্ত্রী এবং বাকিরা যেখানে কান্নাকাটি করছেন, বড় ছেলে মায়ের পাশে চুপচাপ বসে রয়েছে। মাঝে একবার সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে মাকে। তবে মোটামুটি ভাবে নির্বিকারই ছিল। সকলে যখন বিহ্বল, সে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। বাবার মৃত্যুতে ছেলের ওই আচরণ দেখে সন্দেহ জাগে পুলিশের।
পরিবারের দাবি ছিল, অসুস্থ মাকে নিয়ে হাসপাতাল যাচ্ছিলেন রাম সিংহ। সঙ্গে যাচ্ছিলেন অন্য দু’জন। কিন্তু বয়ান মেলাতে গিয়ে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। গাড়ির পিছনের আসন থেকেই চারটি দেহ উদ্ধার হয়। তাতে প্রশ্ন ওঠে, গাড়ি চালাচ্ছিল কে? তাহলে কি অপরাধ ঘটিয়ে পালিয়ে গিয়েছে কেউ? রাম সিংহের দ্বিতীয় স্ত্রীর শরীরে একটি ক্ষত ধরা পড়ে এর পর, যেন কেউ কুপিয়েছিল। এতেই দুর্ঘটনা সম্ভাব্য খুনের ঘটনায় বদলে যায়।
পারিবারিক দ্বন্দ্বই কি অপরাধের দিকে ঠেলে দিল?
অজমেরের পুলিশ সুপার হর্ষবর্ধন জানিয়েছেন, পরিবারে দ্বন্দ্ব ছিল। রাম সিংহের দ্বিতীয় বিয়েকে ঘিরেই বিভাজন তৈরি হয়। প্রথম পক্ষের ছেলেমেয়েরা বাবাকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করে। মায়ের বঞ্চনা তাদের ক্রুদ্ধ করে তোলে। অজমের থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে, শ্রীরামপুর গ্রামে একটি বাগানবাড়িতে দুই স্ত্রী, মা এবং ভাইঝিকে নিয়ে থাকতেন রাম সিংহ।
পুলিশের দাবি, রাম সিংহের বড় ছেলে পাঁচ মাস ধরে খুনের পরিকল্পনা করছিল। নিয়মিত ক্রাইম থ্রিলার দেখত সে। অপরাধের খুঁটিনাটি নিয়ে গবেষণাও করত। কী ভাবে প্রমাণ লোপাট করতে হয়, পুলিশ তদন্তে কোন কোন বিষয়গুলির উপর জোর দেয়, সেই সব নিয়ে পড়াশোনা করেছিল অনলাইন। যে রাতে ওই ঘটনা ঘটে, বিয়ার পান করেছিলেন রাম সিংহ এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। ছেলেটি সারারাত জেগেছিল। ভোর ৪টে নাগাদ বাবার ঘরে ঢোকে সে। ছুরি নিয়ে প্রথমে বাবার উপর হামলা চালায়। কানের কাছে ছুরি ঢুকিয়ে দেয়, যাতে মারা যাতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় রাম সিংহ।
খুনের কিনারা করল পুলিশ
স্বামীর উপর হামলা হতে ঘুম ভেঙে যায় সুরজ্ঞান দেবীর। রাম সিংহের বড় ছেলেকে ঠেকানোর চেষ্টা করেন তিনি। বাড়ির অন্যদের জাগানোর চেষ্টা করেন। ধস্তাধস্তি, চিৎকারে পাশের ঘর থেকে পুসী দেবী এবং মহিলাও ছুটে আসেন। সেই পরিস্থিতিতে রাম সিংহের প্রথম পক্ষের স্ত্রী, মেয়েও ওই ঘরে ছুটে আসে। বাকিদের মেরে ফেলতে ওই দু’জনেরও হাত ছিল বলে দাবি পুলিশের। তদন্তে জানা গিয়েছে, মহিমা পরিবারের সম্পত্তি, টাকাপয়সা, লেনদেনের দেখভাল করতেন। সুরজ্ঞান এবং মহিমা রাম সিংহকে বিপথে চালিত করবেন, সম্পত্তি থেকে তাদের বঞ্চিত হতে হবে বলে আশঙ্কিত ছিল রাম সিংহের প্রথম পক্ষের স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা।
খুনের পর গোটা ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে সাজানো হয়। পুলিশের দাবি, দেহগুলিকে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখা হয় এক এক করে। তার পর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে সব প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাবে বলে ভেবেছিল রাম সিংহের বড় ছেলে। কিন্তু পিছনের আসনে চারজনের বসে থাকা এবং রাম সিংহের বড় ছেলের অস্বাভাবিক আচরণই অপরাধের পর্দাফাঁস করতে সাহায্য় করে তদন্তকারীদের।