নয়াদিল্লি: ভিত গাঁথার আগেই বুকিং শুরু হয়ে যেত এতদিন। এখন আবার ফ্ল্যাট তৈরি হয়ে পড়ে রয়েছে। কেনার লোক নেই। বিজ্ঞাপন দিয়েও মিলছে না তেমন সাড়া। কলকাতা-সহ দেশের বিভিন্ন শহরের অবস্থাই প্রায় এক। এবার সমীক্ষাতেও উদ্বেগের ছবি ধরা পড়ল। বাড়ি, ফ্ল্যাট বিক্রিতে ৬ শতাংশ পতন দেখা গেল দেশের সাতটি শহরে। জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিকের সঙ্গে তুলনা করলে ১১ শতাংশ পতন দেখা গিয়েছে। (Housing Sales Fall)
দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকা, মুম্বই মেট্রোপলিটন এলাকা, পুণে, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, চেন্নাই এবং কলকাতা–গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে এই সাত শহরে এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে বাড়ি-ফ্ল্যাটের বিক্রির হারে ৬ শতাংশ পতন দেখা গিয়েছে। ৬ শতাংশ পতন একনজরে আহামরি কিছু মনে না হলেও, আসলে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথার উপর ছাদ গড়ে তুলতে আসলে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্তরাই। বাড়ি-ফ্ল্যাট তাঁদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। (Middle Class Housing)
বাড়ি-ফ্ল্যাটের বিক্রি কমেছে
দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে বার্ষিক ৬ শতাংশ পতন দেখা গিয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে যেখানে ১৪২৫৫ ইউনিট বিক্রি হয়েছিল, এবার সেই সমখ্যা ১৩৩৬৫। মুম্বই মেট্রোপলিটনে ৮ শতাংশ পতন দেখা গিয়েছে। আগের বছর এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে ৩১২৭৫ ইউনিট বিক্রি হয়েছিল, এবারে সেই সংখ্যা ২৮ হাজার ৭১০। এর মধ্যে পুণেতে পতন দেখা গিয়েছে ১৫ শতাংশ। চেন্নাইয়ে বাড়ি-ফ্ল্যাট বিক্রিতে ৯ শতাংশ পতন দেখা গিয়েছে। গত এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে ৫৬৬০ ইউনিট বিক্রি হলেও, এবার সেই সংখ্যা ৫১৩৫।
তুলনামূলক ভাবে বেঙ্গালুরুতে ১ শতাংশ বিক্রি বেড়েছে। হায়দরাবাদে বৃদ্ধি চোখে পড়ছে ২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে কলকাতায়। গত এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে যেখানে ৩৫২৫ ইউনিট বিক্রি হয়েছিল, এবার সেই সংখ্যা ৩৮৬০। তবে সামগ্রিক ভাবে বাজারে পতনই দেখা যাচ্ছে। কারণ চেন্নাইতে নির্মাতারা ৫৩১৫টি নতুন ইউনিট বাজারে এনেছেন, যা গত বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম। ওই নতুন আবাসনগুলির মধ্যে অধিকাংশ আবার প্রিমিয়াম বা উচ্চমানের, যা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। কলকাতায় ৩৫৫০টি নতুন আবাসন প্রকল্প চালু হলেও, আগের তুলনায় ৩২ শতাংশ কম। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশই প্রিমিয়াম এবং বিলাসবহুল আবাসন, যার দাম ৮০ লক্ষ থেকে ২.৫ কোটির মধ্যে, যা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
এই পতনের কারণ কী?
করোনা-অতিমারির পর বাড়ি-ফ্ল্যাটের বাজার কার্যত ফুলেফেঁপে উঠেছিল। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল নির্মাতাদেরও। সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করেই গত ত্রৈমাসিকে প্রায় ১.০৬ লক্ষ নতুন বিল্ডিং তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি ছিল। কিন্তু বাড়ি-ফ্ল্যাট কেনার লোকই পাওয়া যাচ্ছে না এই মুহূর্তে।
কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হল, তার একাধিক কারণ উঠে এসেছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট এবং সাধারণ আবাসনের পরিবর্তে ঝাঁ চকচকে, বিলাসবহুল আবাসনের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে দেখে নির্মাতারা সেদিকেই ঝুঁকতে শুরু করেন। ছোট ফ্ল্যাটের পরিবর্তে, বড় কমপ্লেক্স, টাওয়ার তৈরির দিকে ঝোঁকেন তাঁরা। কিন্তু সেই সব ফ্ল্যাটের যা দাম, তা মধ্যবিত্তের সাধ্যের বাইরে। অর্থাৎ বর্তমানে বাজারের যা পরিস্থিতি, তাতে পছন্দ মতো বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার সাধ্যই নেই মধ্যবিত্তের।
আরও পড়ুন: ‘তিন দিন পর কেন এলেন’? বারুইপুরে সায়নীকে ঘিরে বিক্ষোভ, বন্ধ করে দেওয়া হল দরজা, সাংসদ বললেন…
বাজারের সমীকরণ
তবে এমনটা যে হওয়ার ছিল, তা নিয়ে একমত বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের মতে, গত কয়েক বছর রেকর্ড বিক্রির পর এমনটা হওয়ারই ছিল। তাই বাড়ি-ফ্ল্যাট বিক্রিতে ধস নেমেছে বলে মানতে নারাজ তাঁরা। তাঁদের মতে, বলা যায় বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে। এর নেপথ্যে কিছু কার্যকারণ চিহ্নিত করেছেন তাঁরা, যেমন–ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ এবং রোজগারের ধারায় পরিবর্তন। পাশাপাশি, কিছু পারিপার্শ্বিক বিষয়ও রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি চালিকাশক্তিগুলি যেহেতু অটুট রয়েছে, তাই এখনও বিনিয়োগ করছেন নির্মাতারা।
CREDAI-এর প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট জি রাম রেড্ডি NDTV-কে জানিয়েছেন, নির্মাণের খরচ বেড়ে গিয়েছে অনেকটাই। বাড়ি কেনার আর্থিক সমীকরণেও পরিবর্তন চোখে পড়ছে। সাধ্যের মধ্যে আবাসন বলতে কী বোঝায়, তার সংজ্ঞাও পুনর্বিবেচনা করে দেখা জরুরি বলে মত তাঁর।
ভারতে রিয়েল এস্টেট বাজারে যে পরিবর্তনগুলি চোখে পড়ছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল–
১) বিলাসবহুল, প্রিমিয়াম আবাসন নির্মাণের দিকে ঝুঁকেছেন নির্মাতারা। ফলে ছোট আবাসন আর তৈরি হচ্ছে না সেভাবে।
২) মানুষ মাথার উপর ছাদ চাইছেন না এমন নয়, বরং বাড়ি-ফ্ল্যাট তাঁদের সাধ্য়ের বাইরে চলে যাচ্ছে। শহরাঞ্চলে যাঁরা মাসে ১ লক্ষ টাকাও রোজগার করেন, তাঁরাও ঝুঁকি নিতে পারছেন না। খরচ বাঁচাতে শহর থেকে দূরে ফ্ল্যাট কিনছেন অনেকে।
৩) বাড়ি-ফ্ল্যাটের চাহিদা কমেনি, তা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।