‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, নির্বাচনের ফলাফলকে সম্মান করবেন তিনি। অন্য দিকে, নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, নির্বাচনে কোন প্রার্থী কেন জিতলেন বা হারলেন, তা নিয়ে তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভূমিকা পালন করতে চান। তাঁর কথায়, ‘‘আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষক হয়ে উঠতে চলেছি। প্রার্থীরা কেন জিতলেন বা হারলেন, তার ভাল-মন্দ সব দিক নিয়েই আলোচনা করব।’’
ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘‘আমরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব। তাঁদের সঙ্গে কাজ করার জন্য মুখিয়ে রয়েছি। সম্ভবত কোনও একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারব।’’
মিডটার্ম নির্বাচন ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান এবং রিপাবলিকান পার্টির কাছে বড় পরীক্ষা হিসাবে উঠে এসেছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না রিপাবলিকানরা, সেদিকেই নজর ছিল রাজনৈতিক মহলের। তবে ভোটের আগে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার বিষয়ে নিঃশর্ত আশ্বাস দেননি ট্রাম্প। কয়েক দিন আগেও তিনি বলেছিলেন, ‘‘নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তবেই ফল মেনে নেব।’’ ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর বার বার ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। সেই কারণে এ বারও ফল অপছন্দ হলে তা চ্যালেঞ্জ করবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি, চাপে রিপাবলিকানরা
নির্বাচনের সাম্প্রতিক প্রবণতায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সাউথ ক্যারোলাইনা এবং টেক্সাসের সেনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। অন্য দিকে, অ্যাক্সিওসের খবর অনুযায়ী, ওহায়োর প্রাক্তন গভর্নর শেরড ব্রাউন রিপাবলিকান সেনেটর জন হাস্টেডকে পরাজিত করেছেন।
প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আগে থেকেই ছিল বেশ সংকীর্ণ। ২১৮-২১৪ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল রিপাবলিকানরা। তিনটি আসন ছিল শূন্য। ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজন ছিল এই ব্যবধান অতিক্রম করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত সমীক্ষাতেও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি বলে ইঙ্গিত মিলেছিল।
তবে সেনেটের লড়াই তুলনামূলক ভাবে কঠিন ছিল। ১০০ আসনের সেনেটে রিপাবলিকানদের হাতে ছিল ৫৩টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা নির্দল সদস্যদের নিয়ে বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যা ছিল ৪৭। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে ডেমোক্র্যাটদের একাধিক আসনে জয় প্রয়োজন ছিল।
এ বারের নির্বাচনে টেক্সাসের মতো ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন বলে বিবেচিত রাজ্যেও সাফল্য এসেছে। ট্রাম্প-সমর্থিত রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে টেক্সাসের সেনেট আসনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো। এর ফলে গত ৩২ বছরে প্রথম বার টেক্সাসের রাজ্যস্তরের নির্বাচনে জয় পেল ডেমোক্র্যাটরা।
এ ছাড়াও নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার। জর্জিয়ায় নিজের সেনেট আসন ধরে রেখেছেন জন অসফ। ওহায়োতে শেরড ব্রাউনের পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সাউথ ক্যারোলাইনা এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারের সেনেট আসনেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ভোটারদের?
নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে আমেরিকার নাগরিকদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নিয়ে অসন্তোষের ইঙ্গিত মিলেছে। বিশেষ করে অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ভোটারদের একাংশের মধ্যে।
আমেরিকার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের যৌথ উদ্যোগে এসএসআরএস পরিচালিত এক্সিট পোল অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ভোটার মনে করেছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ এই নির্বাচন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটার ক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট। পাশাপাশি, প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার চান, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি আরও বাড়াক কংগ্রেস।
নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের হয়ে সক্রিয় ভাবে প্রচার করেছিলেন ট্রাম্প। সমর্থকদের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, যেন তাঁকে প্রার্থী হিসাবে বিবেচনা করেই ভোট দেন তাঁরা। তাই এই নির্বাচনের ফল শুধু প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নয়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্সির জনপ্রিয়তারও পরীক্ষা হিসাবে দেখা হচ্ছে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। এমনকি প্রশাসনের আধিকারিকদের তলব করার ক্ষমতাও থাকবে তাঁদের হাতে। সেনেটের নিয়ন্ত্রণ বদল হলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের কর্মসূচিও আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তবে চূড়ান্ত ফল নির্ভর করছে এখনও গণনা বাকি থাকা ভোট এবং হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলির উপর। নির্বাচনের পূর্বাভাসে ডেমোক্র্যাটদের বড় সাফল্যের ইঙ্গিত মিললেও আনুষ্ঠানিক গণনা ও ফলের শংসাপত্র প্রকাশের প্রক্রিয়া এখনও বাকি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্সিতে এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।