বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন সংঘাতের পর থেকেই বিশ্ব অর্থনীতি চাপে ছিল। সেই সময় অপরিশোধিত তেল, গ্যাস, সার, ভোজ্যতেল, ধাতু ও খাদ্যপণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। বর্তমানে ইরানকে ঘিরে চলা সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও পণ্যের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে এবং বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল, সার, ভোজ্যতেল এবং বহু শিল্পক্ষেত্রের কাঁচামালের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে ভারতের আমদানি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার, টাকার মূল্য, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার উপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের বহু গুরুত্বপূর্ণ আমদানি মার্কিন ডলারে করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রা ইচ্ছেমতো তৈরি করা যায় না; তা আসে রপ্তানি, প্রবাসী আয়, পরিষেবা ও বিনিয়োগ থেকে। সেই অর্থ ব্যয় হয় অপরিশোধিত তেল, এলএনজি, সার, ইলেকট্রনিক পণ্য, সফটওয়্যার, ভোজ্যতেল ও সোনা আমদানিতে। তাই আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো এবং জ্বালানির অপচয় রোধের মতো পদক্ষেপকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমানো গেলে অপরিশোধিত তেলের আমদানি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি গণপরিবহণ ব্যবহার, দেশীয় পর্যটন এবং ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যের ব্যবহার দেশের মধ্যেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও খরচকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
একই সঙ্গে প্রাকৃতিক চাষ, ইথানল মিশ্রণ, সৌরচালিত পাম্প এবং নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের ছোট ছোট ব্যবহারগত পরিবর্তন মিলেই জাতীয় স্তরে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো, দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদে আত্মনির্ভরতা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা IOCL, BPCL এবং HPCL দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শিল্পমহলের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, যুদ্ধজনিত বিমা খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ থাকা সত্ত্বেও দেশে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে।
ভারতের পরিশোধনাগার, উপকূলীয় টার্মিনাল, এলপিজি বটলিং প্ল্যান্ট, পাইপলাইন নেটওয়ার্ক ও অভ্যন্তরীণ ডিপোগুলিকে এই পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা চলতে থাকলেও ভারত আপাতত জ্বালানি সরবরাহ, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখার উপরই জোর দেবে।