প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেদারল্যান্ডস সফরের সময় এই বিরল চোল যুগের শিলালিপিগুলি ভারতকে ফিরিয়ে দিল নেদারল্যান্ডস৷ নেদারল্যান্ডসে ‘লাইডেন প্লেটস’ নামেও পরিচিত এই প্রাচীন তাম্র শিলালিপি চোল সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন৷ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এগুলি ডাচদের দখলে ছিল এবং লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ছিল।
ভারত সরকার, ডাচ সরকার এবং লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক আলোচনার পর অবশেষে এই প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এই তাম্রলিপি চোল বংশের শক্তিশালী সম্রাট রাজরাজা চোলা ১-এর আমলের৷ যার সময়কাল ৯৮৫ থেকে ১০১৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বলেই মনে করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এগুলি তামিল ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ এবং বিদেশে সংরক্ষিত চোল যুগের অন্যতম সেরা শিলালিপি।
ওই তাম্রলিপিতে নাগাপট্টিনমের ‘চূড়ামণি বিহার’-এর জন্য ভূমি রাজস্ব ও কর দানের উল্লেখ রয়েছে। ‘চূড়ামণি বিহার’ বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেছিলেন বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের শাসক শ্রী মারা বিজয়তুঙ্গা বর্মণ৷
ইতিহাসবিদদের মতে, এই শিলালিপিগুলি দক্ষিণ ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্য, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে। এই শিলালিপি থেকে পাওয়া যায়, সেই সময়ের হিন্দু শাসকরাও বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলিকে সমর্থন করতেন, যা বিভিন্ন ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
গবেষকদের মতে, সেই সময়ে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশা ইন্দোনেশিয়া সফর করেছিলেন বলে মনে করা হয়। পাশাপাশি, নালন্দায় আসা বহু চীনা পর্যটকও এই অঞ্চল হয়ে ভারতে প্রবেশ করতেন।
আনাইমঙ্গলম তামার লিপি গুলির আকারও অত্যন্ত বিশাল। এতেও রয়েছে ২১ টি বড় এবং ৩টি ছোট তামার ফলক, যার মোট ওজন প্রায় ৩০ কিলোগ্রাম। সবগুলি একটি বৃত্তাকার তামার রিং দিয়ে বাঁধা, যাতে চোল সাম্রাজ্যের রাজমোহর খোদাই করা রয়েছে। মূল অনুদানপত্রটি রাজরাজা চোলের সময় জারি হলেও, ইতিহাসবিদদের মতে তাঁর পুত্র রাজেন্দ্র চোলা ১ পরে তা স্থায়ী সংরক্ষণের জন্য তাম্রফলকে খোদাই করার নির্দেশ দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলি শুধুমাত্র প্রশাসনিক নথি নয়, বরং মধ্যযুগীয় দক্ষিণ ভারতের বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধ ও বিশ্বসংযুক্ত সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল৷
প্রায় ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে শাসক বিজয়ালয় চোলা তাঞ্জাভুর দখল করার পর চোল সাম্রাজ্যের উত্থান শুরু হয়। চোল শাসনকালে তামিল সভ্যতায় বাণিজ্য, শিল্প, স্থাপত্য ও প্রশাসনে ব্যাপক উন্নতি হয়।
এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন হল বৃহদিস্ভরা মন্দির ,যা রাজরাজা চোল প্রথম ১০ম শতাব্দীর শেষভাগে নির্মাণ করেছিলেন। মহাদেবকে উৎসর্গ করা এই মন্দির বর্তমানে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত। চোল যুগের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যও বিশ্বজুড়ে শিল্পকুশলতার জন্য আজও সমাদৃত।