কলকাতা: বুথফেরত সমীক্ষায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছিল। কিন্তু আমূল পাল্টে যাবে সব কিছু, তা আঁচ করতে পারেননি কেউই। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল অপ্রত্যাশিত বিজেপি নেতৃত্বের কাছেও, যে কারণে এই নির্বাচনকে ‘মানুষের লড়াই’ বলছেন। আর পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণণূলের এই পরাজয়ে শুধু বিজেপি নয়, জাতীয় রাজনীতিতে লাভবান হবে কংগ্রেসও। কারণ স্তরে জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি-র প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না কংগ্রেসের। (West Bengal Election 2026)
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের পরই দিল্লিতে বিজেপি বিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন মমতা। সেই লক্ষ্যপূরণে সমমনস্ক দলগুলির কাছে নিজে থেকেই তদ্বির করেন। লোকসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে দিল্লিতে যখন I.N.D.I.A জোট গড়ে উঠছে, সেই সময় কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা মল্লিকার্জুন খড়গেকে বিরোধীদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করার প্রস্তাব দেন খোদ মমতা। আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালও মমতার সেই প্রস্তাবে সায় দেন। (Mamata Banerjee-Rahul Gandhi)
আরও পড়ুন: ভবানীপুরে গণনা বন্ধ হয়ে গেল, আধ ঘণ্টা ধরে স্থগিত, কারণ অস্পষ্ট
নেহাত সৌজন্য নয়, বরং রাহুল গাঁধী যাতে বিরোধী শিবিরের মুখ না হয়ে ওঠেন, তাই মমতা এবং কেজরী ওই কৌশলী অবস্থান নিয়েছিলেন বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তুলনামূলক ভাল ফল করে কংগ্রেস। লোকসভার বিরোধী দলনেতা হয়ে ওঠেন রাহুল। তবে সেই সময়ও বিরোধী জোটের ‘যোগ্য’ মুখ হিসেবে মমতার নাম উচ্চারিত হচ্ছিল আড়ালে-আবডালে। বিশেষ করে হরিয়ানা এবং মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস পরাজিত হওয়ার পর সেই গুঞ্জন আরও জোর পায়। দাবি ওঠে, কংগ্রেস নয়, তৃণমূলই পারে বিজেপি-কে ঠেকাতে।
কোনও রাখঢাক না করেই সেই সময় তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্য়ায়কে বলতে শোনা যায়, “গত তিন-চার বছর ধরে ওরা (কংগ্রেস) কী করেছে? I.N.D.I.A জোটের নেতা কে? এখনই ঠিক করে ফেলা উচিত। কংগ্রেসের ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠিত এখন। শুধু কংগ্রেস হারেইনি, I.N.D.I.A জোটের আমরাও হেরে গিয়েছি। আমরা কংগ্রেসের উপর আস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু ওরা কাজে করে দেখাতে পারেনি। আমাদের অবস্থানটা বোঝা দরকার। সবাই মমতার সমালোচনা করছিলেন। কিন্তু উপবির্বাচনে ছ’টি আসনে জিতেছি আমরা। ১ লক্ষ ব্যবধানে জিতেছি আমরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর আস্থা রেখেছেন মানুষ। উনি একজন যোদ্ধা। সাংসদ থেকেছেন, রেলমন্ত্রী থেকেছেন। বিরোধী দলনেতা যেই হোন না কেন, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতা আছে ওঁর (মমতার)।”
আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র মুখ্যমন্ত্রী কে? মঙ্গলে হবে সিদ্ধান্ত? শপথগ্রহণ ২৫ বৈশাখ
I.N.D.I.A জোটকে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছে গোপন করেননি মমতাও। তাঁকে বলতে শোনা যায়, “আমি I.N.D.I.A জোট গঠন করি। কে নেতৃত্ব দেবে, তা ওরা ঠিক করবে। ওরা যদি চালাতে না পারে, আমি কী করব? আমি বলব, সকলকে একজোট হতে হবে।” তিনি বিজেপ বিরোধী জোটকে নেতৃত্ব দিতে রাজি কি না জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে মমতা বলেন, “আমাকে সুযোগ দেওয়া হলে, মসৃণ ভাবেই চালাব।” মমতার নামে সেই সময় সায় দিতে দেখা যায় অন্য বিরোধী দলগুলিকেও। রাষ্ট্রীয় জনতা দলের প্রধান লালুপ্রসাদ যাদব জানান, মমতাকে সুযোগ দেওয়া উচিত। কারও বিরোধিতা করা উচিত নয়। উদ্ধব ঠাকরে দাবি করেন, বিজেপি-র বিরুদ্ধে মমতাই I.N.D.I.A জোটকে ভাল নেতৃত্ব দিতে পারবেন।
এমনকি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার চলাকালীনও দিল্লিকে আগামী লক্ষ্য ঘোষণা করেন মমতা। বলেন, “আমি বাংলায় জন্মেছি। বাংলাতেই শেষ নিঃশ্বাস পড়বে। কিন্তু বাংলায় জয়ী হয়ে দিল্লি যাব আমি। সব দলকে একত্রিত করব। আমি ক্ষমতা চাই না। দিল্লি থেকে বিজেপি-কে সম্পূর্ণ রূপে উৎখাত করতে চাই।” কিন্তু সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর মমতার দল তৃণমূলকেই মাটি ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হল। বরং বহু বছর পর রাজ্যে খাতা খুলতে সফল হয়েছে কংগ্রেস।
শুধু তাই নয়, সোমবার কেরলেও জয়যুক্ত হয়েছে কংগ্রেস। তারা সিপিএম-এর পিনারাই বিজয়কে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। তামিলনাড়ুতে আবার পরাজিত হয়েছে I.N.D.I.A জোটের অন্যতম শক্তি DMK. সেখানে জয়ী হয়েছে থালাপতি বিজয়ের TVK, যাদের সঙ্গে বেশ সখ্য রয়েছে বিজেপি-র। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে বিরোধী বলতে যা বোঝায়, জাতীয় রাজনীতিতে এই মুহূর্তে তা কংগ্রেসই। আম আদমি পার্টি পঞ্জাবে ক্ষমতায় থাকলেও, সেখানে তাদের অবস্থা টালমাটাল। রাঘব চাড্ডা একসঙ্গে ছয় সাংসদকে নিয়ে দল ছাড়ায় দলের অস্তিত্বই এখন সঙ্কটে। উত্তর-পূর্বে বিরোধী শিবির থেকে একক ভাবে বিজেপি-র মোকাবিলা করতে সক্ষম কোনও দল নেই। ফলে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণ সরলরেখায়, যার একদিকে বিজেপি–দেশের ক্ষমতাসীন দল এবং অন্য দিকে, কংগ্রেস, প্রধান বিরোধী দল। বিজেপি-র সামনে প্রধান বিরোধী হওয়ার দৌড়ে কংগ্রেসের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না।