দেশের এমন বহু রাজ্য রয়েছে যেখানে আমরা প্রায় প্রতি নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল দেখতে পাই, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই দীর্ঘ সময় ধরে এক রাজনৈতিক শক্তি এবং এক মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বের উপর আস্থা রাখে। অন্তত, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস তাই বলে৷ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসন থেকে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা ১৫ বছরের সরকার— বাংলার রাজনীতি ধারাবাহিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, ঘন ঘন পরিবর্তনকে নয়।
এবার শুভেন্দু অধিকারী বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন। এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে— জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তিনিও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতি উপভোগ করতে পারবেন?
এক নেতার উপর ভরসার রাজনীতি বিষয়ক, টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত কয়েকজন নেতার হাতেই দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রীভূত থেকেছে। প্রায় ৫০ বছরে মূলত মাত্র তিনজন মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসর নিয়ন্ত্রণ করেছেন, যা ভারতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
জ্যোতি বসু ২৩ বছরেরও বেশি সময় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং তারপরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য৷ ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত টানা ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। এরপর ২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত পরপর তিন দফায় সরকার গড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ, অন্যদিকে কর্নাটক, মহারাষ্ট্র বা উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যে এরই মধ্যে বারবার নেতৃত্ব বদল ও জোট অস্থিরতা দেখা গিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম বড় কারণ শক্তিশালী ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সিপিএম হোক বা পরে তৃণমূল কংগ্রেস— বাংলার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলি বুথস্তরে এমন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করেছিল, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
এছাড়াও, বাংলার ভোট রাজনীতিতে শুধুমাত্র উন্নয়ন বা লেনদেনভিত্তিক বিষয় নয়, বরং আবেগ ও মতাদর্শও বড় ভূমিকা পালন করে। বামফ্রন্ট একসময় শ্রেণি রাজনীতি ও ভূমি সংস্কারের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। পরে তৃণমূল কংগ্রেস বাঙালি আঞ্চলিক পরিচয় এবং জনমুখী কল্যাণনীতির প্রতীক হিসেবে দাবি করে। ফলে ভোটারদের একবার কোনও রাজনৈতিক আবেগের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হলে, তা দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়।
দুর্বল বিরোধী শক্তিও এই ধারাবাহিকতার অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন বামেদের বিরুদ্ধে কার্যকর চ্যালেঞ্জ গড়ে তুলতে পারেনি কংগ্রেস। পরে বাম ও কংগ্রেস, দু’পক্ষই তৃণমূলকে রুখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিজেপি পরে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এলেও, তৃণমূলের সমতুল্য সংগঠন গড়ে তুলতে তাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, গ্রামীণ স্তরে কল্যাণমূলক প্রকল্প, স্থানীয় পরিকাঠামো ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর ধারাবাহিক বিনিয়োগও ভোটারদের আনুগত্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। সাধারণ মানুষের একাংশের মতে, সরকারি সুবিধা, গ্রামীণ রাস্তা, ভর্তুকি ও স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থায়িত্বের অন্যতম কারণ।
শুভেন্দু কি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইকনমিক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুভেন্দু অধিকারী বর্তমানে বাংলার বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী জননেতা এবং তৃণমূলের দীর্ঘদিনের সংগঠন কাঠামো সম্পর্কেও তাঁর বিস্তর অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিজেপির এই জয়, বাংলায় প্রথমবার কোনও সর্বভারতীয় দলকে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সরাসরি সমর্থন এনে দিয়েছে।
যদি বিজেপি গ্রামাঞ্চল ও বুথস্তরে স্থায়ী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, তবে বাংলার ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে শুভেন্দুর পক্ষেও কাজ করবে। অর্থাৎ, একবার কোনও দলকে “স্বাভাবিক শাসক শক্তি” হিসেবে মেনে নিলে বাংলা সাধারণত দীর্ঘ সময় সেই দলের পাশেই থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, যে সরকার নিজেদের ‘অপরিহার্য’ শাসক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, বাংলা সাধারণত দীর্ঘ সময় তাদেরই সমর্থন করেছে। বামফ্রন্ট তিন দশকের বেশি সময় সেই জায়গা ধরে রেখেছিল।