বালোচিস্তানের ঘোষণায় যদিও এখনও আন্তর্জাতিক কোনওরকম স্বীকৃতি মেলেনি, তবে তবুও এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে চিনের বহু বিলিয়ন ডলারের চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC)-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে। এটি বেজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।
প্রায় ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৬ লক্ষ কোটিরও বেশি) মূল্যের এই প্রকল্পটি প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর গ্বদর-কে সড়ক, রেলপথ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে চিনের শিনজিয়াং অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে এই করিডর।
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গওয়াদর বন্দর, যা CPEC-এর সবচেয়ে কৌশলগত সম্পদ। প্রশ্ন উঠছে, যদি বালোচিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়, তাহলে পাকিস্তান ও চিনের মধ্যে হওয়া চুক্তিগুলির ভবিষ্যৎ কী হবে?
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, মালিকানা (Ownership) এবং পরিচালনার অধিকার (Operation) এক বিষয় নয়। গ্বদর বন্দর ভৌগোলিকভাবে বালোচিস্তানের মধ্যেই অবস্থিত। ফলে বালোচিস্তান যদি ভবিষ্যতে স্বীকৃত সার্বভৌম রাষ্ট্র হয়, তাহলে ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের নীতিতে বন্দরটি সেই রাষ্ট্রের অংশ হবে।
তবে তার অর্থ এই নয় যে পাকিস্তানের সঙ্গে চিনের সমস্ত চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
বর্তমানে চায়না ওভারসিজ পোর্টস হোল্ডিং কোম্পানি (COPHC) পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে গ্বদর বন্দরের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এই চুক্তি চিনকে শুধুমাত্র পরিচালনার অধিকার দিয়েছে, বন্দরের সার্বভৌম মালিকানা নয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া স্বাধীন বালোচিস্তান চাইলে পাকিস্তানের করা সমস্ত বাণিজ্যিক চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য হবে না। নতুন সরকার চাইলে বিদ্যমান চুক্তি বহাল রাখতে পারে, নতুন করে আলোচনা করে শর্ত বদলাতে পারে অথবা প্রয়োজনে বাতিলও করতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে দেশীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক সালিশি সংক্রান্ত নিয়ম মানতে হবে।
যদি যথাযথ আইনি কারণ ছাড়া চুক্তি বাতিল করা হয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
একইভাবে, গ্বদর বন্দরের পরিচালনা, খনি, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অবকাঠামো সংক্রান্ত পাকিস্তানের পুরনো চুক্তিগুলিও স্বাধীন বালোচিস্তান পুনর্বিবেচনা করতে পারে। নতুন স্বাধীন হওয়া একাধিক দেশে অতীতে এমন নজির রয়েছে।
গ্বদর বন্দরই CPEC-এর দক্ষিণ প্রান্ত, যা চিনকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
যদি পাকিস্তান গওয়াদরের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে বর্তমান CPEC কাঠামো কার্যত আগের রূপে আর কার্যকর থাকবে না। করিডর সচল রাখতে হলে চিনকে স্বাধীন বালোচিস্তানের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করতে হতে পারে।
এমন চুক্তি না হলে গওয়াদর থেকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যাওয়া সড়ক, রেল ও অন্যান্য প্রকল্প রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
এছাড়া CPEC-এর অধীনে নির্মিত মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামোর মালিকানাও ঋণচুক্তির ওপর নির্ভর করবে। অধিকাংশ প্রকল্প পাকিস্তানের নামে নেওয়া সার্বভৌম ঋণের মাধ্যমে অর্থায়িত হয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধের দায় পাকিস্তানেরই থাকবে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্র বিভাজন, ঋণ ভাগাভাগি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আলোচনায় এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে CPEC প্রকল্পে কর্মরত চিনা প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও আধিকারিকরা পাকিস্তানের জারি করা ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করছেন।
স্বাধীন বালোচিস্তান হলে সেই অনুমতিগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর থাকবে না। নতুন সরকার চাইলে নতুন করে অনুমতি দিতে পারে, বর্তমান কর্মীদের থাকতে দিতে পারে, চিনা কর্মীর সংখ্যা কমাতে পারে অথবা নতুন শ্রম ও নিরাপত্তা নীতি চালু করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের কাছে আইনি মালিকানার চেয়ে বড় উদ্বেগ নিরাপত্তা। দীর্ঘদিন ধরেই বালোচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলির হামলার লক্ষ্য হয়েছে CPEC প্রকল্প ও চিনা নাগরিকরা।
যদি বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে প্রকল্পগুলির নিরাপত্তা খরচ বাড়বে, অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করতে হবে, নির্মাণকাজে বিলম্ব হবে, বিমার খরচ বাড়বে এবং পাকিস্তান পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে বেজিংয়ের উপর কূটনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পেতে পারে।
গওয়াদর বন্দরকে পাকিস্তান CPEC-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদ হিসেবে তুলে ধরেছে।
তবে পাকিস্তানের গ্বদর পোর্ট অথরিটি জানিয়েছে, বন্দরের আয় থেকে বালোচিস্তান সরকার কোনও অংশ পায় না, যদিও পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে চায়না ওভারসিজ পোর্টস হোল্ডিং কোম্পানির হাতে।
বহু বালোচ সংগঠনের অভিযোগ, তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের সুবিধা ইসলামাবাদ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাই বেশি পেয়েছে, অথচ স্থানীয় মানুষ কর্মসংস্থান, অবকাঠামো ও উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই CPEC বন্ধ হয়ে যাবে, চিনের বিনিয়োগ থেমে যাবে বা আন্তর্জাতিক সীমান্ত বদলে যাবে, এমনটা নয়।
তবে যদি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিংসা আরও বাড়ে অথবা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে CPEC পরিচালনা আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল, জটিল এবং অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।
চিনের কাছে এই মুহূর্তে বিষয়টি মূলত নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ, আর তার পরেই ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।