বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের জন্য লেখা চিঠিতে তৃণমূলের পক্ষ থেকে তাঁদের সই জাল করা হয়েছে বলে বিধানসভার অধ্যক্ষকে চিঠি দিয়েছিলেন তৃণমূলের দুই নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত এবং সন্দীপন৷ এ দিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই সেকথা জানান৷ এরপরেই ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে বহিষ্কার করে দেয় তৃণমূল৷ সিদ্ধান্তের কথা বিধানসভার অধ্যক্ষকেও জানিয়ে দিয়েছে তৃণমূল৷
যার ফলে এখন থেকে বিধানসভায় আনঅ্যাটাচড বিধায়ক হিসেবেই ধরা হবে ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে৷ বিধায়ক থাকলেও এখন থেকে আর বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়ক হিসেবে গণ্য করা হবে না তাঁদের৷ গতকাল কালীঘাটে তৃণমূলের ডাকা বৈঠকে ৬০ জন বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন৷ ফলে বৈঠক ডেকেও বাতিল করতে হয় তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে৷ ফলে তৃণমূল নেতৃত্বের প্রতি দলেরই বিধায়কদের কতটা আনুগত্য রয়েছে, তা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে৷
সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই তৃণমূলের অনেক বিধায়কই ঋতব্রত এবং সন্দীপন সাহার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেছেন৷ বিদ্রোহী এই দুই বিধায়ককে কেন্দ্র করেই তৃণমূলে বড়সড় ফাটল ধরে কি না, সেই প্রশ্নও ঘুরছে রাজনৈতিক মহলে৷ আর এই সূত্রেই উঠে আসছে মহারাষ্ট্র মডেলের কথা৷
দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করলেও খাতায় কলমে এখন তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ৮০৷ ফলে ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে ঘিরে যদি তৃণমূলে বিদ্রোহী বিধায়কের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তাহলে দলের প্রতীকও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে৷
আইন বলছে, ঋতব্রত এবং সন্দীপন যদি দুই তৃতীয়াংশের বেশি তৃণমূল বিধায়কের (৫৩ জন বিধায়কের) সমর্থন নিজেদের দিকে টানতে পারেন, সেক্ষেত্রে তাঁরা দলত্যাগ বিরোধী আইনের কোপে পড়বেন না৷ বরং তাঁরা তখন তৃণমূলের ঘাসফুল প্রতীকেরও দাবি জানাতে পারবেন৷ ঠিক যেমনটা হয়েছিল মহারাষ্ট্রে শিবসেনা এবং এনসিপি-র ক্ষেত্রে৷ সেই সম্ভাবনার কথা একেবারে নাকচও করেননি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়৷ উলুবেড়িয়ার পূর্বের বিধায়ক বরং ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে বলেন, কালকে কী হবে বলতে পারব না৷ বেঁচে থাকতে পারব কি না গ্যারান্টি আছে৷ তবে একটা ভরসা আছে, জনগণ বাঁচাবে৷
২০১৯ সালে বিধানসভা ভোটে শিবসেনা এবং বিজেপি জোট মহারাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়৷ বিজেপি পায় ১০৫টি আসন, শিবসেনা জয়ী হয় ৫৬টি আসন৷ আর এর থেকেই বিজেপি-র সঙ্গে শিবসেনার সংঘাতের সূত্রপাত৷ কারণ কম আসন পেয়েও শিবসেনা চেয়েছিল তাদের পরিবার থেকে কেউ মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী হোক৷ কিন্তু বিজেপি রাজি হয়নি৷ শেষ পর্যন্ত শিবসেনা সমর্থন প্রত্যাহার করে৷
সরকার গড়তে প্রথমে শরদ পাওয়ারের এনসিপি-তে ভাঙন ধরায় বিজেপি৷ শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের নিয়ে সমর্থন করেন বিজেপি-কে৷ মুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপি-র দেবেন্দ্র ফড়ণবীশ, উপমুখ্যমন্ত্রী হন অজিত পাওয়ার৷
এর পাল্টা চাল হিসেবে শরদ পাওয়ার কংগ্রেস এবং শিবসেনার সঙ্গে কথা বলে মহাবিকাশ অঘোরি জোট তৈরি করেন৷ সরকার টিকবে না বুঝে গিয়ে দেবেন্দ্র ফড়ণবীশ ইস্তফা দেন৷ এর পর এনসিপি-কংগ্রেস-শিবসেনা জোটের নতুন সরকার তৈরি হয় মহারাষ্ট্রে৷ নতুন মুখ্যমন্ত্রী হন উদ্ধব ঠাকরে৷
২০২২ সালে ফের রাজনৈতিক ডামাডোল তৈরি হয় মহারাষ্ট্রে৷ এনসিপি-র পর এবার ভাঙন ধরে শিবসেনায়৷ একনাথ শিন্ডে ৪০ জন বিধায়ক নিয়ে গুয়াহাটির হোটেলে চলে যান৷ বিজেপি-কে সমর্থন করেন তিনি৷ শিন্ডে পন্থী শিবসেনা বিধায়কদের সমর্থনে মহারাষ্ট্রে সরকার গড়ে বিজেপি৷ নির্বাচন কমিশনের কাছে শিবসেনার প্রতীক দাবি করলেন৷ নির্বাচন কমিশন সেই আর্জি অনুমোদনও করে৷ কারণ শিবসেনার দুই তৃতীয়াংশের বেশি বিধায়কের সমর্থন ছিল শিন্ডের পক্ষে৷ শেষ পর্যন্ত শিবসেনা চিরাচরিত তির ধনুক প্রতীক পেয়ে যান একনাথ শিন্ডে৷ একই ভাবে দলের প্রতীক হারিয়েছিলেন শরদ পাওয়ারও৷ মশাল প্রতীক পান উদ্ধব ঠাকরে৷ এবার বাংলাতেও এই মহারাষ্ট্র মডেলের পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না, সেটাই এখন দেখার৷