তথ্য অনুযায়ী, তেল বিপণন সংস্থাগুলি (OMCs) ১৫ মে, ১৯ মে এবং ২৩ মে— এই তিন দফায় পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়ায়। সব মিলিয়ে পেট্রলের দাম লিটারপিছু প্রায় ৪.৭৪ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৪.৮২ টাকা বেড়েছে। প্রায় চার বছর পর এই প্রথম জ্বালানির দামে বড়সড় ঊর্ধ্বগতি দেখা গেল।
সরকারি সূত্রে দাবি, হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে যে ধাক্কা আসে, তার পুরো বোঝা সাধারণ মানুষের উপর চাপানো হয়নি। শুল্ক কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির ক্ষতি বহন এবং আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে দীর্ঘদিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক পশ্চিম এশিয়া সংকট— দুই ক্ষেত্রেই ভারত অন্যান্য বহু দেশের তুলনায় আলাদা জ্বালানি মূল্যনীতি নিয়েছিল। যেখানে বিশ্বের বহু দেশ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুচরো মূল্য বাড়িয়ে দেয়, সেখানে ভারত ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে একাধিকবার আবগারি শুল্ক কমিয়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে খুচরো দামের সংশোধন স্থগিত রেখেছে।
মার্চে বড় সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের
সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ, যখন কেন্দ্র পেট্রল ও ডিজেলের উপর বিশেষ অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক (SAED) কমায়। ডিজেলের উপর কার্যত আবগারি শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও তার পুরো প্রভাব গ্রাহকদের উপর পড়েনি। শুধু এই সিদ্ধান্তের জেরেই চলতি অর্থবর্ষে সরকারের প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
বিপুল ক্ষতির মুখে তেল সংস্থাগুলি
দাম বৃদ্ধির আগে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ আকার নিয়েছিল। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, একসময় পেট্রলে লিটারপিছু প্রায় ২৪ টাকা এবং ডিজেলে প্রায় ৩০ টাকা ‘আন্ডার-রিকভারি’ হচ্ছিল। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় কম দামে জ্বালানি বিক্রি করতে হচ্ছিল সংস্থাগুলিকে। ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল বলে দাবি। পরে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর ফলে সেই চাপ কিছুটা কমে।
বিশ্বের তুলনায় অনেক কম দাম বেড়েছে ভারতে
আন্তর্জাতিক তুলনায় দেখা যাচ্ছে, ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ মে-র মধ্যে মায়ানমারে পেট্রলের দাম প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। পাকিস্তানে বৃদ্ধি ৫৪ শতাংশের বেশি, আমেরিকায় ৪৪ শতাংশেরও বেশি এবং ব্রিটেনে প্রায় ১৯ শতাংশ। সেখানে একই সময়ে ভারতে জ্বালানির দাম বেড়েছে মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি।
উপসাগরীয় দেশগুলিকে বাদ দিলে, যেগুলি সরাসরি জ্বালানিতে ভর্তুকি দেয়, আমদানিনির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারতের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বের অন্যতম কম বলে দাবি কেন্দ্রের।
ইউপিএ বনাম এনডিএ: তেল বন্ড নিয়ে রাজনৈতিক তরজা
সরকারি সূত্রের দাবি, ইউপিএ আমলে খুচরো জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘অয়েল বন্ড’-এর পথ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে প্রায় ১.৩৪ লক্ষ কোটি টাকার তেল বন্ড দেওয়া হয়, যার বোঝা ভবিষ্যতের করদাতাদের উপর গিয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার সরাসরি আবগারি শুল্ক কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি রোখার চেষ্টা করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও এখন ধাপে ধাপে জ্বালানির দাম বাড়ানো শুরু হয়েছে, তবুও পরপর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময়ে ভারত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি আর্থিক চাপ নিজে বহন করেছে বলেই মত কেন্দ্রের।
এক সরকারি সূত্রের কথায়, “দুই ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য শুধু দেখনদারির নয়। একদিকে এখনই মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলানো, অন্যদিকে সেই চাপ ভবিষ্যতের উপর ঠেলে দেওয়া।”