একই নির্দেশিকা Small Finance Bank, Regional Rural Bank, Payment Bank, Local Area Bank এবং Urban Co-operative Bank-এর ক্ষেত্রেও একযোগে জারি করা হয়েছে। অর্থাৎ, টাকার উপরে সুদের হারে স্বচ্ছতা ও অভিন্নতার এই নতুন নিয়ম শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক নয়, গোটা ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক ধরনের আমানত, যা সাধারণ গ্রাহকদের আলোচনায় খুব একটা আসে না—‘বাল্ক ডিপোজিট’ (Bulk Deposit)। RBI-এর নতুন নির্দেশিকার গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে বাল্ক ডিপোজিট আসলে কী।
এককালীন ৩ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিটকে বাল্ক ডিপোজিট বলা হয়। সাধারণ খুচরো বা রিটেল গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এত বড় অঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট খুব একটা দেখা যায় না।
সাধারণত বিভিন্ন সংস্থা, বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্ট এবং উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিরা (HNI) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাঙ্কে বড় অঙ্কের টাকা জমা রেখে সুদ পাওয়ার জন্য বাল্ক ডিপোজিট করেন।
যেহেতু এই ধরনের আমানতে বিপুল অঙ্কের টাকা জড়িত থাকে, তাই অতীতে ব্যাঙ্কগুলি অনেক সময় আলোচনার ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণ করত। কোনও কোনও ক্ষেত্রে পছন্দের প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহককে বেশি সুদের হার দেওয়া হত, অথচ একই দিনে একই অঙ্কের টাকা জমা রাখা অন্য কোনও গ্রাহক তুলনামূলক কম সুদ পেতেন। এবার সেই ব্যবস্থায় লাগাম টানছে RBI।
১ অক্টোবর থেকে ঠিক কী কী পরিবর্তন হচ্ছে?
প্রতিদিন সকাল ১০টা ১০ মিনিটের মধ্যে বাল্ক ডিপোজিটের সুদের হার প্রকাশ করতে হবে ৷ ১ অক্টোবর থেকে প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ককে প্রত্যেক কর্মদিবসে সকাল ১০টার মধ্যে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বাল্ক ডিপোজিটের সুদের হার প্রকাশ করতে হবে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ সকাল ১০টা ১০ মিনিটের মধ্যে সুদের হার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতেই হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, কোনও আমানতের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক যে সুদের হার দেবে, তা ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সুদের হারের সঙ্গে হুবহু মিলতে হবে। প্রকাশিত হারের থেকে আলাদা কোনও সুদের হার কোনও আমানতকারীকে দেওয়া যাবে না।
এর অর্থ, আপনি যদি কোনও সংস্থার ট্রেজারি অফিসার, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী অথবা উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি হন এবং বাল্ক ডিপোজিট করতে চান, তাহলে প্রতিদিন সকালে ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইট দেখে জানতে পারবেন সেদিন ঠিক কত সুদের হার পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থাৎ, গোপনে দর কষাকষি করে আলাদা সুদের হার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। একই ধরনের আমানতে অন্য কেউ আপনার থেকে বেশি সুদ পাচ্ছেন কি না, সেই সংশয়ও অনেকটাই দূর হবে।
একই অঙ্কের আমানতে আলাদা গ্রাহকের জন্য আলাদা সুদ নয় ৷
দ্বিতীয় পরিবর্তনটির মূল লক্ষ্য হল আমানতকারীদের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখা।
একই দিনে একই অঙ্কের টাকা জমা রাখা হলে ব্যাঙ্ককে সমস্ত শাখা এবং সমস্ত গ্রাহকের ক্ষেত্রে একই সুদের হার দিতে হবে। অর্থাৎ, একই দিনে একই অঙ্কের টাকা জমা রাখছেন এমন দুই গ্রাহকের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক আলাদা আলাদা সুদের হার দিতে পারবে না।
এই নিয়মের মাধ্যমে বিশেষ বা পছন্দের প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের গোপনে বেশি সুদের হার দেওয়ার প্রথায় লাগাম টানতে চাইছে RBI। অক্টোবর থেকে এমনটা আর করা যাবে না।
তৃতীয় পরিবর্তনটি তুলনামূলকভাবে প্রযুক্তিগত। এই নিয়মে ব্যাঙ্কগুলির উপর বিধিনিষেধ বাড়ানোর পরিবর্তে তাদের কিছুটা বেশি নমনীয়তা দেওয়া হয়েছে।
Liquidity Coverage Ratio বা LCR নামে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং কাঠামোর অধীনে বিভিন্ন ধরনের আমানতের ঝুঁকি আলাদা ভাবে মূল্যায়ন করা হয়।
বিষয়টি সহজ ভাবে বোঝা যায়। আর্থিক চাপ বা সংকটের পরিস্থিতিতে কিছু ধরনের আমানত দ্রুত তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, আবার কিছু আমানত তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে।
রিটেল গ্রাহকদের ফিক্সড ডিপোজিট সাধারণত তুলনামূলক স্থিতিশীল। বেশিরভাগ মানুষ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এই টাকা তোলেন না। কিন্তু কোনও বড় সংস্থার বাল্ক ডিপোজিট দ্রুত তুলে নেওয়া হতে পারে, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট সংস্থার হঠাৎ নগদ অর্থের প্রয়োজন হলে।
এতদিন ঝুঁকির এই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সমস্ত বাল্ক ডিপোজিটের ক্ষেত্রে একই ধরনের সুদের হার নির্ধারণের নিয়ম ছিল। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যে আমানতের ক্ষেত্রে টাকা দ্রুত তুলে নেওয়ার ঝুঁকি বেশি বা LCR-এর ভাষায় যার ‘Run-off Rate’ বেশি, সেই ধরনের আমানতে ব্যাঙ্ক বেশি সুদের হার দিতে পারবে।
সহজ কথায়, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে আপনার আমানতকে যদি তুলনামূলক বেশি অস্থির বা ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সেই টাকা আকৃষ্ট করা এবং ব্যাঙ্কে ধরে রাখার জন্য ব্যাঙ্ক বেশি সুদ দিতে পারবে।
এই নিয়ম দেশের অভ্যন্তরীণ বাল্ক ডিপোজিটের পাশাপাশি বড় অঙ্কের NRI বা বিদেশে বসবাসকারী আমানতকারীদের নন-রেসিডেন্ট বাল্ক ডিপোজিটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
স্বচ্ছতা সংক্রান্ত নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবেন বড় কর্পোরেট আমানতকারী এবং বিভিন্ন সংস্থার ট্রেজারি টিম। অর্থাৎ, যাঁরা ৩ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের বাল্ক ডিপোজিট করেন।
এতদিন তাঁরা কত সুদ পাবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করত ব্যাঙ্কের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার দর কষাকষির ক্ষমতার উপর। কিন্তু অক্টোবর থেকে প্রতিদিন সকালে সুদের হার প্রকাশ্যে জানাতে হবে। একই দিনে একই অঙ্কের টাকা জমা রাখলে প্রত্যেক আমানতকারী একই সুদের হার পাবেন।
যে সমস্ত উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বড় অঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট করেন, তাঁরাও এই বৈষম্যহীন নিয়মের সুবিধা পাবেন। কোনও ব্যাঙ্ক যদি নির্দিষ্ট দিনে ৩ কোটি টাকার ডিপোজিটের জন্য একটি নির্দিষ্ট সুদের হার ঘোষণা করে, তাহলে সেই দিন ৩ কোটি টাকা জমা রাখা প্রত্যেক গ্রাহককে একই সুদের হার দিতে হবে। তিনি ব্যাঙ্কের বহু বছরের পুরনো গ্রাহক নাকি নতুন গ্রাহক, তার ভিত্তিতে সুদের হার বদলানো যাবে না।
LCR-এর সঙ্গে যুক্ত নতুন সুদ নির্ধারণের নিয়মের ফলে বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থাও উপকৃত হতে পারে। বেশি টাকা তুলে নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এমন আমানতের ক্ষেত্রে বেশি সুদ দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ব্যাঙ্কগুলি তাদের তারল্য বা Liquidity আরও কার্যকর ভাবে পরিচালনা করতে পারবে। পাশাপাশি আমানতের প্রকৃত ঝুঁকি ও খরচের ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়ানোও এই পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য।
৩ কোটি টাকার কম অঙ্কের আমানত রাখা সাধারণ রিটেল গ্রাহকরা এই নির্দিষ্ট পরিবর্তনগুলির দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হবেন না, কারণ নতুন নিয়মগুলি মূলত বাল্ক ডিপোজিটকে কেন্দ্র করে আনা হয়েছে। তবে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সুদের হার এবং বাস্তবে গ্রাহককে দেওয়া সুদের হার একই রাখার বৃহত্তর নীতি সমস্ত আমানতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
RBI-এর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আমানতের সুদের হার সংক্রান্ত বর্তমান কাঠামো পর্যালোচনা করার পর এই পরিবর্তনগুলি আনা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হল স্বচ্ছতা এবং তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা আরও উন্নত করা।
প্রতিদিন সকাল ১০টা ১০ মিনিটের মধ্যে সুদের হার প্রকাশের নিয়ম বাল্ক ডিপোজিটের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন।
এর ফলে বাল্ক ডিপোজিটের সুদের হার নির্ধারণের ব্যবস্থা মূলত ব্যক্তিগত আলোচনা ও ব্যাঙ্কের সঙ্গে গ্রাহকের সম্পর্কনির্ভর প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে প্রকাশ্য এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘোষিত ব্যবস্থায় পরিণত হবে।
কোনও আমানতকারী, প্রতিযোগী ব্যাঙ্ক কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইট দেখে জানতে পারবে সেদিন ঠিক কত সুদের হার ঘোষণা করা হয়েছে।
একই ধরনের আমানতে আলাদা গ্রাহককে আলাদা সুদের হার না দেওয়ার নিয়ম ব্যাঙ্কের প্রকাশিত হার এবং বাস্তবে দেওয়া হারের মধ্যে ফারাক থাকার সম্ভাবনাও কমাবে।
সব মিলিয়ে এই পরিবর্তনগুলি ভারতের বাল্ক ডিপোজিটের বাজারকে আরও স্বচ্ছ এবং প্রকাশ্য সুদ নির্ধারণ ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবে।
আপনি যদি বড় অঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট করেন, তাহলে কী করবেন?
আপনি বা আপনার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যদি কোনও বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কে ৩ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট করেন, তাহলে ১ অক্টোবর থেকে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
ডিপোজিট করার আগে প্রতিদিন সকাল ১০টার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে সেদিনের প্রকাশিত বাল্ক ডিপোজিটের সুদের হার দেখে নিন।
মনে রাখবেন, একই দিনে একই অঙ্কের টাকা জমা রাখা অন্য যে কোনও আমানতকারীকে ব্যাঙ্ক যে সুদের হার দিচ্ছে, আপনিও সেই একই সুদের হার পাওয়ার অধিকারী। ব্যাঙ্কের যে কোনও শাখাতেই এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
যদি কোনও ব্যাঙ্ক আপনাকে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সুদের হারের থেকে আলাদা কোনও হার অফার করে, তাহলে সেটি RBI-এর নির্দেশিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং বিষয়টি RBI Ombudsman-এর কাছে জানানো যেতে পারে।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞ বা ব্রোকারেজ সংস্থার প্রকাশিত মতামত, সুপারিশ ও পরামর্শ সম্পূর্ণ তাঁদের নিজস্ব। কোনও বিনিয়োগ বা ট্রেডিং সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যোগ্য ব্রোকার বা আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া উচিত।