কাজিরাঙার সোনালি বাঘ
অসমের অন্যতম বিরল বন্যপ্রাণের অন্যতম হল কাজিরাঙার ‘গোল্ডেন টাইগার’৷ সোনালি বাঘ৷ একে অনেকে আদর করে গোল্ডেন ট্যাবি টাইগারও বলে থাকেন৷ বাংলার রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মতো উজ্জ্বল কমলা রঙ আর গাঢ় কালো ডোরা দাগ নয়, এই বাঘের গায়ে থাকে হালকা সোনালি লোম আর ক্রিম রঙের নরম ডোরা, যেন রূপকথার কোনও প্রাণী৷
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিরল রঙের কারণ একটি জিনগত পরিবর্তন, যাকে ‘ওয়াইডব্যান্ড জিন’ মিউটেশন বলা হয়। এর ফলে বাঘের শরীরে কালো রঞ্জকের পরিমাণ কমে যায়। প্রাকৃতিক বন্য পরিবেশে এমন সোনালি বাঘের দৃষ্টান্ত অত্যন্ত বিরল৷ শোনা যায় কাজিরাঙার জঙ্গলে এমন মাত্র চারটি বাঘই রয়েছে। এই বাঘের ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। এখন কাজিরাঙায় বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের অনেকেরই স্বপ্ন থাকে জিপ সাফারিতে এলিফ্যান্ট গ্রাসল্যান্ডে এই অপূর্ব রাজকীয় শিকারিকে অন্তত এক ঝলক দেখার।
কাজিরাঙা ভারতের অন্যতম সফল বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ প্রকল্পের উদাহরণ। এখানে যেমন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি একশৃঙ্গ গণ্ডার পাওয়ার যায়, তেমনই বাঘের জনঘনত্বের নিরিখেও এটি বিশ্বের অন্যতম বনভূমি। জলাভূমি, ঘন বন আর প্রচুর শিকার থাকার কারণে এই জঙ্গল বাঘেদের জন্য আদর্শ আবাসস্থল।
মানসের রহস্যময় কালো চিতা
একদিকে যদি থাকে রাজকীয় ‘গোল্ডেন টাইগার’, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে রহস্যময় ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’৷ মানস জাতীয় উদ্যানের ঘন জঙ্গলের গভীরে, আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই কালো চিতাকে তার বিরল বৈশিষ্ট্যের কারণেই অনেকে আজকাল বলছেন, ‘ঘোস্ট অফ দ্য জাঙ্গল’৷ ব্ল্যাক প্যান্থার কোনও আলাদা প্রজাতি নয় কিন্তু, বরং এটি চিতাবাঘের একটি ‘মেলানোসাইটিক’ ফর্ম৷ যে ক্ষেত্রে, সংশ্লিষ্ট চিতাবাঘের শরীরে এত বেশি পরিমাণে মেলানিন উৎপন্ন হয়, যার জেরে এটিকে সম্পূর্ণ রূপে কালো দেখায়৷ তবে, সূর্যালোকে, হাল্কা হলেও চিতাবাঘের লোমের ‘রোসেট প্যাটার্ন’ অত্যন্ত হাল্কাভাবে দৃশ্যমান হয় এদের শরীরে৷
অসমে কালো চিতার দেখা পাওয়া অত্যন্ত বিরল। তাই এর কোনও ছবি বা ভিডিও সামনে এলেই বন্যপ্রাণপ্রেমীদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা ছড়ায়। সম্প্রতি মানসে কালো চিতাবাঘের দেখা পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পর্যটন আর ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির জগতে হইচই পড়ে গেছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ফটোগ্রাফাররা বড় বড় ক্যামেরা নিয়ে মানসে ছুটে যাচ্ছেন, যদি একবার অনন্ত জঙ্গলের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা রহস্যময় ওই প্রাণীটিকে ক্যামেরাবন্দি করা যায়।
ভুটান সীমান্তের কাছে পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত মানাস জাতীয় উদ্যান ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এখানে বাঘ, হাতি, গণ্ডার, গোল্ডেন ল্যাঙ্গুর, বুনো মহিষসহ ৪৫০-র বেশি প্রজাতির পাখি রয়েছে। সংরক্ষণবিদদের মতে, ব্ল্যাক প্যান্থারের সংখ্যা বা দেখা পাওয়া বাড়ার অর্থ হতে পারে জঙ্গলের পরিবেশ আরও সুস্থ হয়ে উঠছে।
কাজিরাঙার ‘ভূতের মতো সাদা হরিণ’
অসমের কাজিরাঙার তৃণভূমির আরেক আশ্চর্য হল ‘অ্যালবিনো হোয়াইট ডিয়ার’৷ ‘ঘোস্ট অফ দ্য জাঙ্গল’, বরফের মতো সাদা লোম, ফ্যাকাশে চোখ আর গোলাপি ত্বক৷ অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা নিজেও সোশ্যাল মিডিয়ায় এই হরিণের সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরেছেন। হরিণটির রঙ এমন সাদা হওয়ার কারণ, ‘অ্যালবিনিজম’ নামে একটি জিনগত সমস্যা, যার ফলে শরীরে মেলানিন তৈরি হয় না। যদিও দেখতে অত্যন্ত সুন্দর, কিন্তু বনে এই প্রাণীদের বাঁচা কঠিন। কারণ তাদের উজ্জ্বল সাদা রঙ সহজেই বাঘ বা চিতার চোখে পড়ে যায়। ফলে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা তাদের পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও মাঝেমধ্যেই কুয়াশা ঢাকা ঘাসভূমির মধ্যে দিয়ে এই সাদা হরিণকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়, আর সেই দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে দেয়।
বাড়ছে বন্যপ্রাণ পর্যটন
অসমের এই বিরল প্রাণীদের জনপ্রিয়তা রাজ্যের পর্যটনকেও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ফটোগ্রাফার, গবেষক, তথ্যচিত্র নির্মাতা আর পর্যটকরা কাজিরাঙা ও মানাসে আসছেন এই অসাধারণ প্রাণীদের খোঁজে।
২০২৫-২৬ মরশুমে কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানে রেকর্ড সংখ্যক পর্যটক এসেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪.৬৮ লক্ষ মানুষ এই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে ঘুরতে এসেছেন, যার মধ্যে ৩০ হাজারেরও বেশি বিদেশি পর্যটক।
অনেকের কাছেই এই বিরল প্রাণীদের একবার দেখা মানে জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।