মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে ভারতীয় ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপিছু ৭০ ডলারের ঘর থেকে ১২০ ডলারের উপরে পৌঁছে যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ১২৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একই সঙ্গে এলপিজির সৌদি কনট্রাক্ট মূল্য ৪৬ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ১৪.২ কেজির একটি রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের আমদানি-নির্ভর খরচ ১,৬০০ টাকারও বেশি হয়ে দাঁড়ায়।
তবে যুদ্ধজনিত বিমা খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহ ঘাটতি এবং বাজারে উদ্বেগ সত্ত্বেও দেশের কোথাও পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি ফুরিয়ে যায়নি বা রান্নার গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়নি। জুন মাসের মাঝামাঝি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ভারত বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলির মধ্যে সবচেয়ে কম খুচরো মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব রেকর্ড করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকে গড়ে ওঠা জ্বালানি পরিকাঠামো এবং বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থাই এই সাফল্যের মূল কারণ। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে এলপিজি আমদানি টার্মিনালের সংখ্যা ১১ থেকে বেড়ে ২২-এ পৌঁছেছে। এলপিজি পাইপলাইন নেটওয়ার্ক ২,৩১১ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ৬,২৪২ কিলোমিটার হয়েছে। ফলে আমদানি ক্ষমতা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে বছরে ৩২.৩ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছায়।
এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থাও উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস লিমিটেড (আইএসপিআরএল)-এর অধীনে ৫.৩৩ মিলিয়ন টন কৌশলগত তেল মজুত ভারতকে প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করে।
সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করাও বড় ভূমিকা নিয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে ভারত ২৭টি দেশ থেকে তেল আমদানি করত, বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪১ হয়েছে। লিবিয়া, গ্যাবন, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি ও গায়ানার মতো নতুন সরবরাহকারী যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি আমেরিকা ও রাশিয়ার সঙ্গে আমদানি সম্পর্কও আরও মজবুত হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে যায়।
সংকটের সময় কেন্দ্র সরকার সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি চাপ না দিয়ে নিজেই আর্থিক বোঝা বহন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ পেট্রোল ও ডিজেলের উপর লিটারপিছু ১০ টাকা কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক কমানো হয়। এর ফলে সরকারের প্রায় ১.৭ লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলিও দুই মাসের বেশি সময় ধরে জ্বালানির খুচরো মূল্য অপরিবর্তিত রাখে। ১৫ মে একবার মাত্র লিটারপিছু ৩ টাকা মূল্যবৃদ্ধি করা হয় এবং পরে ধাপে ধাপে মোট ৭ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সম্পূর্ণ চাপ সাধারণ মানুষের উপর পড়েনি।
রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রেও সরকার দ্রুত পদক্ষেপ করে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৮ মার্চ এলপিজি নিয়ন্ত্রণ নির্দেশ জারি করা হয়। দেশের রিফাইনারিগুলিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় এলপিজি উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দৈনিক উৎপাদন ৩৫ হাজার টন থেকে বেড়ে ৫৪ হাজার টনে পৌঁছে যায়।
সরকার ১৪.২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ৯৪২ টাকায় সীমাবদ্ধ রাখে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার ১০.৫৮ কোটি উপভোক্তাকে ৩০০ টাকা ভর্তুকি দেওয়ায় তাঁদের কার্যকর খরচ নেমে আসে ৬৪২ টাকায়। তেল সংস্থাগুলির ক্ষতি পূরণে কেন্দ্র ৩০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তাও অনুমোদন করে।
এদিকে বাণিজ্যিক এলপিজি ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করে শিল্প ও বড় রান্নাঘরগুলিকে বিকল্প জ্বালানির দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে দৈনিক এলপিজি চাহিদা ৯০ হাজার টন থেকে কমে ৭০ হাজার টনে নেমে আসে এবং জুনের শেষ সপ্তাহে অধিকাংশ বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া সম্ভব হয়।
বিশ্বের বহু দেশ যেখানে জ্বালানি ঘাটতি, রেশনিং এবং মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়েছিল, সেখানে ভারত কোনও ধরনের জ্বালানি রেশনিং, যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে হাঁটেনি। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মায়ানমার, বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ এই সঙ্কটে চাপে পড়লেও ভারতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা এড়াতে সক্ষম হয়েছে ভারত। বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার ৭২৮ বিলিয়ন ডলারের উপরে বজায় ছিল, জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকে এবং মূল্যস্ফীতিও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্ধারিত সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রিত ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং দ্রুত নীতিগত হস্তক্ষেপের ফলেই এই নজিরবিহীন সঙ্কট সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।