জানা গিয়েছে, গত ৩ অক্টোবর ওই দুই সহ-পাইলটকে হেফাজতে নেওয়া হয়। হামাম আল-হাম্মামির পরিচিতি, যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য উগ্রপন্থী মতাদর্শ সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করতেই এই পদক্ষেপ। তদন্তে উঠে এসেছে, তাঁরা একসঙ্গে কাজ করতেন, একই সময়ে বিমানের ডিউটি করতেন এবং সম্ভবত একই আবাসিক ভবনেও থাকতেন।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, তাঁদের মধ্যে যোগাযোগের ধরন ও ঘনত্ব ঠিক কেমন ছিল। একসঙ্গে বিমান চালানো, সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা করা এবং ব্যক্তিগত ডিজিটাল কথোপকথন—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামাম কখনও তাঁদের কাছে উগ্রপন্থী মতাদর্শের কথা বলেছিলেন কি না, শহিদ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন কি না কিংবা ৯/১১-র মতো হামলার উল্লেখ করেছিলেন কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে।
UAE-র তদন্তকারীদের দাবি, হামাম আল-হাম্মামি জেরায় স্বীকার করেছে যে সে একাই এই কাজ করেছে। তার সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের ফরেনসিক পরীক্ষায় আল-কায়দার একাধিক পরিচিত নেতার ছবি পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছে ওসামা বিন লাদেন, আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং হুমাম খলিল আবু-মুলাল আল-বালাওয়ির ছবি। ২০০৯ সালে আফগানিস্তানের খোস্তে CIA-র একটি ঘাঁটিতে আত্মঘাতী হামলার সঙ্গে আল-বালাওয়ির নাম জড়িয়েছিল। ওই পোস্টগুলির সঙ্গে প্রায়ই ইজরায়েলের সামরিক বিমানের ভিডিয়োও দেখা গিয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি।
আল-কায়দাপন্থী কিছু সংবাদমাধ্যম এবং ইয়েমেনভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দা ইন দ্য অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা (AQAP) প্রকাশ্যে হামামকে ‘নায়ক’ হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার উত্তরাধিকার ফিরিয়ে এনেছে সে।
তবে UAE-র গোয়েন্দা কর্তাদের বক্তব্য, আল-কায়দা, আইএসআইএস, হামাস কিংবা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠিত জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে হামামের সরাসরি সাংগঠনিক যোগসূত্রের প্রমাণ এখনও মেলেনি।
তদন্তকারীদের ধারণা, হামাম নিজেই উগ্রপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে ক্ষোভ এবং প্রায় এক দশক ধরে উগ্রপন্থী চিন্তাভাবনার প্রভাব তার মধ্যে কাজ করেছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, যাত্রীবাহী বিমানকে আত্মঘাতী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা হামামের মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। আল-কায়দার হামলার কৌশলের সঙ্গে এই ধারণার মিল রয়েছে বলে তদন্তকারীদের বক্তব্য। ২০০১ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার প্রতি তার গভীর আকর্ষণ থেকেই এই ভাবনা তৈরি হয়েছিল বলে মনে করছেন তাঁরা।
তদন্তকারীদের দাবি, ফ্লাইদুবাইকে নির্দিষ্টভাবে নিশানা করেছিল হামাম, কারণ এই বিমান সংস্থা দুবাই থেকে তেল আভিভের মধ্যে সরাসরি বিমান পরিষেবা চালায়। গোয়েন্দা নথি অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনার আগে একই রুটে আরও দু’বার যাত্রা করেছিল সে। হামলার আগে রুট ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতেই এই যাত্রাগুলি করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ।
এই ঘটনার তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। হামামের বিরুদ্ধে ওমানে থাকাকালীন কিছু নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ ও সতর্কতার বিষয় ছিল বলে জানা গিয়েছে। তা সত্ত্বেও কীভাবে সে ফ্লাইদুবাইয়ের কঠোর নিরাপত্তা যাচাই এবং ব্যাকগ্রাউন্ড চেক পেরিয়ে গেল, তা খতিয়ে দেখছেন UAE-র তদন্তকারীরা এবং আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষকেরা।
আটক দুই মালদ্বীপের সহ-পাইলটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক বিমানের ককপিটে কোনও কর্মীর মধ্যে উগ্রপন্থী মতাদর্শের লক্ষণ থাকলে তা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সংস্থার অভ্যন্তরীণ যাচাই ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অন্যতম বিষয়।
বর্তমানে ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য এবং গোয়েন্দা রিপোর্ট মিলিয়ে তদন্ত চালানো হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, তদন্ত এখনও চলছে।