আসলে, হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL) ইঙ্গিত দিয়েছে যে দেশের অন্যতম স্বদেশি যুদ্ধবিমান প্রকল্প এখন দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। তেজস Mk2-এর প্রথম প্রোটোটাইপের সংযোজন (অ্যাসেম্বলি) দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং ২০২৭ সালে এটি প্রথমবারের মতো আকাশে উড়তে পারে।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ফার্নবরো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারশো ২০২৬-এ HAL-এর প্রধান জানান, প্রকল্পটি নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। প্রথম প্রোটোটাইপের উড়ান ভারতের স্বদেশি যুদ্ধবিমান উন্নয়ন কর্মসূচির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।
কেন বিশেষ তেজস Mk2?
তেজস Mk2 কেবল তেজস Mk1A-এর উন্নত সংস্করণ নয়, বরং এটিকে সম্পূর্ণ নতুন এবং আরও শক্তিশালী যুদ্ধবিমান হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। এই বিমানটি বর্তমান তেজস সিরিজ এবং ভবিষ্যতের অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট (AMCA)-এর মধ্যে থাকা সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করবে।
তেজস Mk2-তে থাকবে আরও দীর্ঘ এয়ারফ্রেম, বেশি জ্বালানি বহনের ক্ষমতা, অধিক অস্ত্র বহনের সক্ষমতা এবং আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী ইঞ্জিন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জিই অ্যারোস্পেস (GE Aerospace)-এর F414-INS6 ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে, যা প্রায় ৯৮ কিলোনিউটন থ্রাস্ট উৎপন্ন করতে সক্ষম।
এই শক্তিশালী ইঞ্জিনের কারণে তেজস Mk2 ভারী অস্ত্র বহন করে দীর্ঘ দূরত্বের অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত দেশীয় যুদ্ধবিমান:
তেজস Mk2-এ একাধিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে। এতে ভারতের নিজস্ব ‘উত্তম’ AESA (Active Electronically Scanned Array) রাডার ব্যবহার করা হবে, যা দূর থেকে শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান শনাক্ত করতে, একসঙ্গে একাধিক টার্গেট ট্র্যাক করতে এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ (Electronic Warfare)-এর সময় আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে।
এছাড়াও এই যুদ্ধবিমানে আধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম, সেন্সর ফিউশন প্রযুক্তি, নিরাপদ ডেটা লিঙ্ক এবং ভবিষ্যতে আপগ্রেডযোগ্য মিশন কম্পিউটার থাকবে। বিমানের নকশায় ক্যানার্ড উইংস যুক্ত করা হয়েছে, যা এর গতিশীলতা এবং আকাশে নিয়ন্ত্রণক্ষমতা আরও উন্নত করবে।
শত্রুর জন্য আরও বড় হুমকি হবে অস্ত্রভাণ্ডার:
তেজস Mk2-কে একটি মাল্টি-রোল ফাইটার হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। এতে অস্ত্র Mk-1 ও Mk-2 আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, প্রিসিশন-গাইডেড বোমা, অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইল এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক অস্ত্র বহন করা যাবে।
এই বিমানে ১১টি হার্ডপয়েন্ট থাকবে, যার ফলে এটি আরও বেশি অস্ত্র ও জ্বালানি বহন করে উড়তে পারবে। বিমানটিকে আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা (Air Superiority), স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা (Ground Attack), সামুদ্রিক অভিযান (Maritime Strike) এবং শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস (Suppression of Enemy Air Defence – SEAD)-এর মতো বিভিন্ন ধরনের অভিযানের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ তেজস Mk2?
ভারতীয় বায়ুসেনা দীর্ঘদিন ধরেই তাদের পুরনো যুদ্ধবিমানের বহর আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতে তেজস Mk2 মিরাজ-২০০০, জাগুয়ার এবং মিগ-২৯-এর মতো যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে, যুদ্ধবিমানের জন্য ভারতের বিদেশি সংস্থার উপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং দেশের স্বদেশি প্রতিরক্ষা শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
AMCA-র পথও সুগম করবে তেজস Mk2:
তেজস Mk2-কে ভারতের পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট (AMCA)-এর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই বিমানে ব্যবহৃত অ্যাভিওনিক্স, সেন্সর ফিউশন, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং ফ্লাইট কন্ট্রোল প্রযুক্তিগুলি ভবিষ্যতে AMCA প্রকল্পেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL)-এর মতে, প্রথম প্রোটোটাইপের অ্যাসেম্বলি সম্পূর্ণ হওয়ার পর গ্রাউন্ড টেস্টিং, বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা এবং উড্ডয়ন পরীক্ষা (ফ্লাইট টেস্ট) শুরু হবে। এরপর একাধিক প্রোটোটাইপের মাধ্যমে যুদ্ধবিমানটির সক্ষমতা ও কর্মক্ষমতা বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হবে।
তেজস Mk2-এর প্রথম উড়ান ভারতের জন্য শুধু একটি নতুন যুদ্ধবিমানের আত্মপ্রকাশই হবে না, বরং এটি স্বদেশি যুদ্ধবিমান নির্মাণে আত্মনির্ভরতার পথে একটি বড় মাইলফলক এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।