কলকাতা: কার্যত পূরণ হল একটা বৃত্ত। সরকার থেকে বিরোধী আসন ঘুরে ফের সরকারে। এমন এক সরকারে যার সর্বেসর্বা তিনিই! অনেকেই বলছেন এ উত্থান চমকপ্রদ হলেও, একদিনে হয়নি। এ উত্থানের প্রতি বিন্দুতে রয়েছে লড়াই, সংগ্রাম। কথা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে হবু নবম মুখ্যমন্ত্রী (West Bengal CM) শুভেন্দু অধিকারীর ( Suvendu Adhikari)।
ছোটবেলায় প্রতিদিন নিয়ম করে রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেন শুভেন্দু। পছন্দের ছিল মিশনের ভোগ। শিশির অধিকারীর আশঙ্কা ছিল, মেজ ছেলে সংসার ছেড়ে সন্ন্য়াসী হয়ে যাবেন না তো? ক্লাস এইট থেকে টেন অবধি নিয়মিত কাঁথিতে সংঘের শাখায় ট্রেনিং নিতেন শুভেন্দু।
আটের দশকের শেষপর্বে কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি শুভেন্দুর। কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের হয়ে শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভা ভোটে কংগ্রেসের টিকিটে জিতে কাউন্সিলর হন শুভেন্দু অধিকারী। ২০০১ সালে মুগবেড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্রে শুভেন্দুকে প্রার্থী করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু, তিনি তৎকালীন মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দের কাছে হেরে যান।
আরও পড়ুন:- ‘সোনার বাংলা’ গড়তে বদ্ধপরিকর, শপথগ্রহণের আগে প্রশাসনের রাজনীতিকরণ না হওয়ার আশ্বাস অমিত শাহের
২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে তমলুক কেন্দ্রে সিপিএম লক্ষ্মণ শেঠের কাছে পরাজিত হন শুভেন্দু। ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে প্রথমবার জিতে বিধায়ক হন শুভেন্দু অধিকারী। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন শুভেন্দুর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠে অধিকারী পরিবারের মেজ ছেলে। গোটা রাজ্য তাঁর নাম জানতে শুরু করে।
তৃণমূল ক্ষমতায় আসার তিন বছর আগে, ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রথমবার কোনও জেলা পরিষদ দখল করে তৃণমূল। আর সেটা ছিল শুভেন্দুর গড় পূর্ব মেদিনীপুর। এরইসঙ্গে দক্ষিণ ২৪ পরগনাও দখল করে তৃণমূল। সেখানেও প্রচার করেছিলেন শুভেন্দু।
২০০৮ সালেই মদন মিত্রকে সরিয়ে শুভেন্দুকে যুব তৃণমূলের সভাপতি করেন মমতা। ২০০৯-এর লোকসভা ভোটে তমলুকে লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে প্রথম বার সাংসদ হন শুভেন্দু। তার আগে ২০০৬ সালে কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যান পদে বাবার জায়গায় বসেন শুভেন্দু। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে ফের তমলুক কেন্দ্রে জেতেন শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু, তাঁকে যুব তৃণমূলের সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে সৌমিত্র খাঁকে বসানো হয়। যে সৌমিত্র খাঁ এখন বিজেপি সাংসদ। সেইসময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘যুবা’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করা হয়।
২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে জয়ী হন শুভেন্দু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় পরিবহণমন্ত্রী করা হয় তাঁকে। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় তৃণমূলের ফল ভাল না হওয়ায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব থেকে শুভেন্দুকে সরানো হয়। ২০২০-র অগাস্টে তৃণমূলের রাজ্য সরকারি কর্মী সংগঠনের দায়িত্ব থেকে সরানো হয় শুভেন্দুকে। ২৭ নভেম্বর মন্ত্রিত্ব ত্যাগ। এরপর বিধায়ক পদ থেকেও ইস্তফা দেন শুভেন্দু অধিকারী।
২০২০-র ১৯ ডিসেম্বরে অমিত শাহের হাত ধরে বিজেপিতে যোগদান করেন হবু মুখ্য়মন্ত্রী। ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়কে পরাজিত করেন তিনি। বসেন বিরোধী দলনেতার আসনে। পাঁচ বছর পর ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ফের পরাজিত করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়কে। এবার ভবানীপুর থেকে। আরেক আসনে নন্দীগ্রামেও জেতেন বিপুল ভোটে।
এরপরে তাঁকে বঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে রাখছিলেন অনেকে। শুক্রবার কলকাতা বিমানবন্দরের একটা ছবিই সবকিছু স্পষ্ট করে দিয়েছিল। শুভেনদু অধিকারীর পিঠে হাত দিয়ে একেবারে ক্যামেরায় পোজ দিতে দেখা যায় অমিত শাহকে। আর তার কয়েকঘণ্টার মধ্যেই যাবতীয় জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সিলমোহর দিলেন অমিত শাহ।
বৈঠকের পরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন শুভেন্দুই হতে চলেছেন বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। অমিত শাহ বলেন, ‘শুভেন্দু ভাইকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই, আপনি সফল হোন। বাংলার জনতার সব আকাঙ্খা, সব আশা পূরণের মাধ্যম হয়ে উঠুন আপনি। শুভেনদুকে আমি দীর্ঘদিন ধরে চিনি। লড়াকু ব্যক্তি শুভেন্দু। উনি প্রশাসন দেখেছেন আবার তৃণমূলের দূষণকেও দেখেছেন। এখানে সুশাসন দেওয়ার লক্ষ্যে আমাদের দলের সঙ্গে শুভেন্দু সফল হবেন, এই বিশ্বাস আমার আছে।’
তাঁর নাম ঘোষণা পরে হবু মুখ্য়মন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের ৩২১ জন, ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা-কর্মী যাঁরা আত্ম বলিদান দিয়েছেন এবং আমি কথা দিতে পারি, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ বিজেপি কর্মী যাঁরা ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, অত্যাচারিত হয়েছেন, ঘরছাড়া হয়েছেন, মিথ্যা মামলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, আমি তাঁদেরকে কথা দিতে পারি, আগামী দিনে আপনাদের স্বপ্ন পূরণ করার কাজ ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার করবে।’
প্রকৃতঅর্থেই যেন একটা গোটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। আর সেই বৃত্তের শেষে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শনিবারই শপথ নিচ্ছেন পূর্ব মেদিনীপুরের শুভেন্দু অধিকারী।