সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় বেসরকারি উদ্যোগ, উদ্যোক্তা এবং জাতি গঠনে ব্যবসার ভূমিকা নিয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। এই পার্থক্য কেবল মতাদর্শগত নয়, বরং দুই ভিন্ন সময়ের দুই ভিন্ন ভারতের প্রতিফলন।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর যখন জওহরলাল নেহরু দেশের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন ভারতে এমন বড় শিল্পগোষ্ঠী বা সংস্থা খুব কমই ছিল, যারা বিশাল ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধ বা ভারী শিল্প গড়ে তুলতে পারত।
এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে নেহরু রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলের উপর জোর দেন। তাঁর নেতৃত্বে সরকারই দেশের অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। সরকারি সংস্থা, ভারী শিল্প, বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়নের পথ তৈরি করা হয়।
পরবর্তীকালে এই ব্যবস্থাই ‘লাইসেন্স-পরমিট-কোটা রাজ’-এ পরিণত হয়, যেখানে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি অনুমতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নেহরুর বিশ্বাস ছিল, বেসরকারি পুঁজির কাজ হবে জাতীয় পরিকল্পনা এবং সামাজিক অগ্রাধিকারের নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে। সেই সময়ের অর্থনৈতিক ভাষ্যে সমাজতন্ত্র, সরকারি মালিকানা, পরিকল্পিত অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছিল প্রধান শব্দ। উদ্যোক্তাদের গুরুত্ব থাকলেও তাঁদের দেশের উন্নয়নের প্রধান নায়ক হিসেবে তুলে ধরা হতো না।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় ভারতের অর্থনীতি আর ১৯৪৭ সালের মতো দুর্বল বা নবীন ছিল না।
দেশ ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বেসরকারি খাতের বিস্তার, তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতের বৃদ্ধি, ভোক্তা বাজারের সম্প্রসারণ এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্তির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। তখন চ্যালেঞ্জ ছিল নতুন করে শিল্পভিত্তি তৈরি করা নয়, বরং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভারতকে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় আরও শক্তিশালী করে তোলা। এই পরিস্থিতিতে মোদী সরকার উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জাতীয় উন্নয়নের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ হল ২০১৬ সালে চালু হওয়া ‘স্টার্টআপ ইন্ডিয়া’ প্রকল্প। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া, ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো, স্টার্টআপে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো এবং ইনকিউবেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন। তবে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে দেশের মানসিকতায়। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে সরকারি চাকরি, পাবলিক সেক্টরের কর্মসংস্থান এবং প্রচলিত পেশাকেই সাফল্যের প্রধান পথ হিসেবে দেখা হত। মোদী আমলে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতারা নতুন ভারতের সাফল্যের প্রতীক হিসেবে উঠে আসেন। তরুণ উদ্যোক্তারা সরকারি অনুষ্ঠান ও প্রচারাভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।
স্টার্টআপ ইন্ডিয়া যেখানে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ব্যবসাগুলিকে লক্ষ্য করেছিল, সেখানে প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উপর জোর দেয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পথবিক্রেতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর, দোকানদার এবং প্রথমবারের উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া হয়। এর রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বও ছিল ব্যাপক। শুধু বড় শিল্পপতিদের নয়, বরং স্থানীয় দোকানদার, দর্জি, মেকানিক বা রাস্তার হকারকেও দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে ‘উদ্যোক্তা’ শব্দটির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।
মোদী আমলের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলির মধ্যে অন্যতম হল বাণিজ্যের ডিজিটাল রূপান্তর। ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI)-এর মতো উদ্যোগের ফলে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি দেখা গেছে। আজ চায়ের দোকান থেকে সবজি বিক্রেতা—সকলেই কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করছেন। ছোট ব্যবসায়ীরাও স্মার্টফোন ব্যবহার করে ডিজিটাল লেনদেন করছেন। লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য এই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। এটি নেহরুর যুগের উন্নয়ন মডেল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যেখানে অগ্রগতির মানদণ্ড ছিল কারখানা, বাঁধ এবং সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প।
শিল্পনীতির ক্ষেত্রেও মোদী সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নেহরুর মডেল থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা। সরকার নিজে কারখানা গড়ে তোলা ও পরিচালনা করার পরিবর্তে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের উপর জোর দিয়েছে। প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (PLI) প্রকল্পের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল ফোন, সেমিকন্ডাক্টর, ওষুধ এবং সৌরশক্তি উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে সরকার সরাসরি উৎপাদক নয়, বরং সহায়ক ও প্রণোদনা প্রদানকারীর ভূমিকা পালন করছে।
সম্ভবত দুই যুগের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় অর্থনৈতিক ভাষ্যে। নেহরুর সময়ে উন্নয়নের আলোচনায় ‘পরিকল্পনা’, ‘পাবলিক সেক্টর’, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানা’, ‘সম্পদের পুনর্বণ্টন’ এবং ‘সমাজতন্ত্র’-এর মতো শব্দ ছিল প্রধান। অন্যদিকে মোদী আমলে ‘স্টার্টআপ’, ‘উদ্ভাবন’, ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’, ‘ওয়েলথ ক্রিয়েটর’ এবং ‘উদ্যোক্তা’ শব্দগুলি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী একাধিকবার বলেছেন, সম্পদ সৃষ্টিকারীদের সম্মান করা উচিত, কারণ তাঁরাই কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। এই ভাষা স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকে প্রচলিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শব্দভাণ্ডার থেকে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, নেহরুর ভারত যেখানে নতুন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করেছিল, সেখানে মোদীর ভারত উদ্যোক্তা ও বেসরকারি উদ্যোগের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় রচনার চেষ্টা করছে।